০১:২৪ পি.এম
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা মৃত্যুর পর দাফনের স্থান নিয়ে বৈষম্যের শিকার হতেন। সামাজিক কবরস্থানে তাদের মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতির সমাধানে উপজেলা প্রশাসন তাদের জন্য চার শতাংশ জমি কিনেছে। ফলে, এবার তারা নিজেদের জন্য নির্ধারিত কবরস্থানে শেষ আশ্রয় পাবে।
তিন বছর আগে শীতকালে মারা যান তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য ছোহা (৩০)। স্থানীয় কবরস্থানে তার মরদেহ দাফনের অনুমতি না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা বাড়ির আঙিনায় কবর খুঁড়ে তাকে সমাহিত করেন। একইভাবে গুরুদাসপুরের হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরুমাতা নদী সরকারের বাবাকেও স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি।
নদী সরকার এসব অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামের বাসিন্দা। তবে এবার নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য স্থায়ী কবরস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় তিনি উচ্ছ্বসিত।
আরও পড়ুন: ভাণ্ডারিয়ায় নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি, দশ হাজার টাকা জরিমানা
তিনি বলেন, "এত দিন তাদের মৃত্যুর পর দাফনের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছিল না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজের উদ্যোগে এখন সেই সংকটের সমাধান হয়েছে।"
জানা গেছে, কুমারখালী গ্রামের ব্যবসায়ী তৌফিক আলীর কাছ থেকে পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকায় চার শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। জমি কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। জমির গ্রহীতা হিসেবে হিজড়া সম্প্রদায়ের পক্ষে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ গুরুমাতা নদী সরকারের হাতে জমির দলিল তুলে দেন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কেনা এ জমি পুরো উপজেলার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
তৃতীয় লিঙ্গের গুরুদাসপুর উপজেলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় এ সম্প্রদায়ের ৪৫ জন সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২১ জনের বসবাস কুমারখালী গ্রামে। অধিকাংশের স্থায়ী কর্মসংস্থান ও নির্ভরযোগ্য আবাসন নেই। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের নামে একটি স্থায়ী কবরস্থান পাওয়াকে তারা বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। ইতিমধ্যে জমিটি বুঝে নিয়েছেন তারা। এখন মৃত্যুর পর নিজেদের জমিতেই সমাহিত হওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: পাবনায় ছাত্রীনিবাস থেকে কলেজ ছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
সম্প্রদায়ের সদস্য নুপুর, সোনালী, সৌখীন, মাধবী, ইতি ও দীপা বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় সমাজে নানা ধরনের কটূক্তি ও বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের। জন্মগত পরিচয়ের কারণে অনেকেই তাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেন না। বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করা হলেও বিপদে পাশে দাঁড়াতে চান না অনেকে।
তাদের ভাষ্য, জীবিত অবস্থায় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। তবে মৃত্যুর পর দাফন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাদের। গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের দাফনে বাধা দেওয়া হয়। এমনকি নদী সরকারের বাবা আহাদ আলীকেও স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা পর্যায়ের এক সভায় নিজেদের জন্য স্থায়ী কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন নদী সরকার। এরপর শুরু হয় জমি কেনার উদ্যোগ। শেষ পর্যন্ত ইউএনওর সহযোগিতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, মৃত্যুর পর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সামাজিক কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয় না—বিষয়টি জানার পর তিনি ব্যথিত হন। অন্তত মৃত্যুর পর যেন তারা নিজেদের জমিতে সমাহিত হতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সম্প্রদায়ের সদস্যদের পুনর্বাসনসহ আরো কিছু পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন: ব্রহ্মপুত্রের মাঝনদীতে চলন্ত নৌকায় যমজ সন্তানের জন্ম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন