০৬:০০ পি.এম
বাংলাদেশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন ডাক অধিদপ্তরের আওতায় পিরোজপুর-ঝালকাঠি ও বরিশাল অঞ্চলে পোস্ট অফিস ভবন নির্মাণ ও সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অনৈতিক দাবি, ঠিকাদারকে হয়রানি এবং নিজেই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা করার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। ফলে চার থেকে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ কাজ এখনো অসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ ও ২০২২ সালে ডাক অধিদপ্তর বরিশাল, পিরোজপুর -ঝালকাঠি অঞ্চলের পোস্ট অফিস ভবন নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্প দুটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান শামীমুর রাজি। টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পান পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার ঠিকাদার জালাল উদ্দিন। প্রকল্প অনুযায়ী নয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও চার থেকে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলেও অধিকাংশ কাজ অসমাপ্ত রয়েছে।
ঠিকাদার সূত্রে জানা যায়, দুটি প্যাকেজে মোট ১২টি পোস্ট অফিসের নতুন ভবন নির্মাণ, নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং পুরোনো ভবন সংস্কারের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। পিরোজপুর প্যাকেজে কাউখালী, মঠবাড়িয়া ও কাঠালিয়ায় নতুন ভবন নির্মাণ এবং নলছিটি পোস্ট অফিসসহ অন্যান্য সংস্কার কাজ রয়েছে। বরিশাল প্যাকেজে বানারীপাড়া ও মেহেন্দিগঞ্জে নতুন ভবন নির্মাণ এবং কাজলাকাঠি, কলসকাঠি, বাবুগঞ্জ, দামুরা, দাকুরহাট ও উজিরপুরে সংস্কার কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় ডাক অধিদপ্তর।
আরও পড়ুন: আশী বছরের বৃদ্ধ নুরুজ্জমানের চুরি হওয়া অটোরিকশা উদ্ধার করলো জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ
ঠিকাদার জালাল উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, কার্যাদেশ পাওয়ার পর থেকেই প্রকল্প পরিচালক শামীমুর রাজি বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেন। তিনি দাবি করেন, প্রকল্প পরিচালকের চাহিদা পূরণ করতে হলে তাকে নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থের ব্যবস্থা করতে হতো। ওই দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানালে নানা অজুহাতে কাজে বাধা সৃষ্টি করা হয় এবং বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে তাকে হয়রানি করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে প্রকল্প পরিচালক তাকে প্রস্তাব দেন যে, কাজগুলো ঠিকাদারকে করতে হবে না; তিনি নিজেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন এবং ঠিকাদারকে লাভের একটি অংশ দেওয়া হবে। এ প্রস্তাবে রাজি না হয়ে তিনি নিজেই কাজ শুরু করলে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।
ঠিকাদারের দাবি, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দায় এড়াতে ১২টি কাজের মধ্যে দুটি বাতিল করা হয়। চারটি কাজ ইতিমধ্যে শেষ হলেও বাকি ছয়টি কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়েছে। এর মধ্যে কাউখালীর একটি কাজ ঠিকাদার নিজে শুরু করলেও অন্য কয়েকটি কাজ প্রকল্প পরিচালক নিজ উদ্যোগে বাস্তবায়ন করেছেন বলে জানান ঠিকাদার। ঠিকাদারের কথা যাচাই করার জন্য বানারীপাড়া পোস্টমাস্টার নুরুল ইসলাম এর বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঠিকাদারকে আমরা কাজ করতে দেখিনি। প্রকল্প পরিচালক নিজেই অর্থ ব্যয় করে কাজ করিয়েছেন। কিন্তু এখনো কাজ শেষ না হওয়ায় আমরা সমস্যার মধ্যে আছি।”
কাউখালী উপজেলা পোস্টমাস্টার জানান, ২০১৭ সাল থেকে ভাড়া বাড়িতে পোস্ট অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের আগেই নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ও অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণ এবং সেবা পরিচালনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: নকলায় এসবিসি প্রকল্পের এমএনসিএএইচ বিষয়ে জনসংলাপ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল ডাক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় অনেক পোস্ট অফিস এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অথবা ভাড়া বাড়িতে কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে একদিকে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বরিশালের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মনজুরুল আলম বলেন, “দুটি প্রকল্পের আওতায় ঠিকাদার ১২টি কাজ পেয়েছিলেন। কী কারণে কাজগুলো শেষ হয়নি, তা আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। ভবনগুলো সম্পন্ন না হওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় ও ঝুঁকি নিয়ে ডাকসেবা পরিচালনা করতে হচ্ছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক শামীমুর রাজি বলেন, “দ্রুত কাজ শেষ করা হবে।” তবে ঠিকাদারের অভিযোগ এবং নিজে কাজ বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে অভিযোগগুলো শুনলাম। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফ হত্যার আসামি অপূর্বর ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন