০৭:১৩ পি.এম
চীনের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বৃদ্ধি ঘটছে সাফল্যের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চাপ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিলেও, বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় থেকেই এই চাপ শুরু হয়েছে।
পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, পরিবারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থন না পাওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তরুণদের মানসিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চীনের চংকিং শহরের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী চেনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে পড়ার সময় তাঁর বুক ধড়ফড় করত, বুকে চাপ অনুভূত হতো এবং বইয়ের লেখা বুঝতে কষ্ট হতো। প্রথমে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে বলা হয়। পরীক্ষার পর তাঁর বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যা ধরা পড়ে। বিষয়টি জানার পর তাঁর মা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আরও পড়ুন: গুগল ওয়াইওমিংয়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারে ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে
চীনের বিভিন্ন গবেষণায় তরুণদের মানসিক সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ২০২১ সালে বেইজিং অ্যান্ডিং হাসপাতালের নেতৃত্বে পরিচালিত এক জাতীয় জরিপে দেখা যায়, ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এর মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা অন্যতম।
২০২২ সালে চীনা বিজ্ঞান একাডেমির এক প্রতিবেদনে জরিপে অংশ নেওয়া কিশোরদের ১৪ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রার বিষণ্নতার ঝুঁকি পাওয়া যায়। আগের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ১০ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ রয়েছে। নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে এ হার বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই। হংকং পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শিমিন ঝু বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং দ্রুত সামাজিক রূপান্তরের কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে কিশোরদের মানসিক চাপ বাড়ছে।
চেন জানান, তার পড়াশোনার সময়সূচি সকাল ৭টা ২০ মিনিট থেকে রাত ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ছিল। সপ্তাহান্তেও কোচিং ক্লাস করতে হতো।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের প্রতি অন্ধ সমর্থনেই রিপাবলিকানদের ভরাডুবি: জেডি ভ্যান্স
চীনে বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা নবম শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকের সাধারণ শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে শিক্ষার্থীদের বেছে নিতে হয়। অঞ্চলভেদে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সাধারণ উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির সুযোগ পায়। সামাজিকভাবে সাধারণ শিক্ষাকে বেশি মর্যাদা দেওয়ায় অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখে।
পরিবারের সমর্থনের অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। চেনের ভাষ্য, তাঁর মা-বাবা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাঁর মানসিক যন্ত্রণা বুঝতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনি নিজের হাতে স্ট্যাপল দিয়ে আঁচড় কেটে আত্মক্ষতির পথ বেছে নেন।
ডিজিটাল মাধ্যমও নতুন সংকট তৈরি করছে। ভিডিও গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিনোদনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে কিশোরদের শারীরিক ব্যায়াম ও সরাসরি সামাজিক যোগাযোগ কমছে। এতে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে চীনা সরকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ কমানোর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাউন্সেলর নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন সহায়তা বন্ধের পক্ষে এল-সায়েদ, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখ
দেশটির স্টেট কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ৯২ শতাংশ প্রাথমিক এবং ৯৫ শতাংশ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাউন্সেলর রয়েছেন। তবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক নেতিবাচক ধারণা, চিকিৎসকের স্বল্পতা এবং ব্যয়বহুল কাউন্সেলিং বড় বাধা হয়ে আছে।
২০১৯ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, চীনে শিশু ও কিশোরদের জন্য যোগ্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন মাত্র প্রায় ৫০০ জন।
বিশেষজ্ঞ শিমিন ঝুর মতে, শুধু পড়াশোনার চাপ কমানোই যথেষ্ট নয়; প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার মানসিক সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। তাঁর ভাষায়, একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল করলেই যেন শিশুদের মনে না হয়, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান ভেঙে ১২টি নতুন প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা চলছে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন