০৮:৫৩ এম
দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ‘ফ্লাইদুবাইয়ের’ এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক হাইজ্যাক চেষ্টার অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এই আক্রমণকারী কে ছিলেন—যিনি ফ্লাইটটির নাম প্রকাশ না হওয়া কো-পাইলট? ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করার পর তার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এত সব ধোঁয়াশার মধ্যেও, দখলদার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—দেশে ফিরে আসা যাত্রীদের অভ্যর্থনা জানানোর ব্যস্ততায়—এই ঘটনাকে ইসরাইলবিরোধী ‘অপপ্রচারের’ অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে চিহ্নিত করতে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি।
নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন যে, ঘটনার পেছনের আসল মোটিভ বা উদ্দেশ্য নিশ্চিত করার সময় এখনো আসেনি। তবে তিনি আঙুল তুলেছেন ইরানের দিকে। তিনি দাবি করেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যে দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেই ইরান এবং তাদের মিত্ররাই বিদেশে ইসরাইলিদের ওপর হামলা বাড়িয়ে দিতে চাইছে। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ওই কো-পাইলট ‘ইসলামপন্থি উগ্রবাদী ভাবধারায়’ দীক্ষিত হয়েছিলেন, যা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: বসনিয়ায় ইইউ শান্তিরক্ষা মিশনের হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, ৪ নিহত, ১১ আহত
যে রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন, যিনি চারপাশের সব হুমকির মুখে ইসরাইলিদের একমাত্র সত্যিকারের রক্ষাকর্তা—এই হাইজ্যাকের চেষ্টা তার প্রচারণাকে আরও শক্ত ভিত্তি দিচ্ছে। কারণ চলতি মাসের শেষের দিকে হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সংসদীয় নির্বাচন, যা নির্ধারণ করবে নেতানিয়াহু দেশের ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন কিনা।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে এর শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলার সময় হয়তো এখনো হয়নি।’ তিনি যোগ করেন, ‘এটি নিশ্চিতভাবেই নেতানিয়াহুর কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে নতুন গতি আনবে—আর তা হলো ইরানের ওপর তীব্র হামলা পুনরায় শুরু করা। এটি নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটগুলো থেকে নজর সরাতেও সাহায্য করবে এবং সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া তার সতর্কবার্তাগুলোকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারবে।’
এর আগে মঙ্গলবার নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমাদের শত্রুরা আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালাবে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’ তবে তার বিরোধীরা তথ্যপ্রমাণহীন ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ এনে দ্রুতই সেই সতর্কবার্তা উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎস বিমান হামলাকে একটি ‘জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনিও আগের সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আমি যখন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্কবার্তা বা অ্যালার্ট জারি করি, তখন বিদেশে থাকা আমাদের শত্রু হোক আর দেশের ভেতরের খবরাখবর না রাখা সাবেক কর্মকর্তারা হোন—সবারই উচিত কথাগুলো শোনা এবং সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া।’
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে ভারত সমর্থিত সন্ত্রাসীদের হামলা নস্যাৎ, ৫ ড্রোন ভূপাতিত
তবে ইসরাইলি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ—যিনি মঙ্গলবার রাতে নেতানিয়াহুর কাছ থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্রিফিং পেয়েছিলেন—দ্রুতই এই যোগসূত্র নাকচ করে দিয়েছেন। বুধবার তিনি বলেন, ‘গত রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হওয়া নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ে (বিমান হামলার) কাছাকাছি কোনো কিছুর উল্লেখই ছিল না।’
ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করা কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিমান হামলার পর তার প্রতিক্রিয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং সংকটগুলোকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলেরই অংশ।
কিং কলেজ লন্ডনের সিনিয়র টিচিং ফেলো এবং ইসরাইলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ব্রেগম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছেন। যাত্রীরা ইসরাইলে অবতরণ করার পরপরই তাকে কোনো এক ইসরাইলি বীরের (যিনি কো-পাইলটকে ঘায়েল করেছিলেন) সঙ্গে খোশগল্প করতে দেখা গেছে।’
তবে ব্রেগম্যান মনে করেন না যে, নেতানিয়াহু এতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবেন, যদিও জনমত জরিপ বলছে, নির্বাচনে তিনি অল্প ব্যবধানে হেরে যেতে পারেন। ব্রেগম্যান বলেন, ‘এর মাধ্যমে তার কোনো রাজনৈতিক লাভ হবে না। (এই হামলা) আমাদের সবার মতোই তাকেও অবাক করে দিয়েছে।’
আরও পড়ুন: মালদ্বীপে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন, খলিলুর রহমানের আহ্বান
তিনি যোগ করেন, নেতানিয়াহুর একমাত্র আশার আলো হতে পারে যদি ইরানের সঙ্গে এই হামলার যোগসূত্র নিশ্চিত করা যায়, যা তেহরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সেই সংঘাত থেকে দূরে থাকার ইঙ্গিত দিয়ে আসছে।
আল জাজিরাকে ব্রেগম্যান বলেন, ‘এখানে স্পষ্টতই নিরাপত্তার বড় ধরনের ত্রুটি ছিল, যার তদন্ত করা হবে। এটি আরেকটি ৯/১১-এর মতো পরিণতি ডেকে আনতে পারত, তবে কিছু সাহসী যাত্রী এবং প্রচুর সৌভাগ্যের কারণে তা এড়ানো গেছে।’
নিপীড়নের বয়ান
বুধবার মার্কিন গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, বিমান ছিনতাইয়ের এই ব্যর্থ চেষ্টার পেছনে কারা ছিল, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে কো-পাইলটের এই কাজ হলো ‘অভাবনীয় মাত্রার ধর্মান্ধতা এবং ঘৃণার’ ফল। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনার কারণে সৃষ্ট ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গেই এই অনুভূতির যোগসূত্র রয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘যৌন হয়রানি, ধর্মান্তরের চাপ’: আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গের খ্রিস্টানরা
গাজায় ইসরাইলের গণহত্যায় ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের মধ্যে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তার সমান্তরালেই নেতানিয়াহুর ভুক্তভোগী ও নিপীড়িত সাজার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোতে একের পর এক হামলা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস তাণ্ডবে রাষ্ট্রের যোগসাজশ থাকার জোরালো অভিযোগও উঠেছে। এর ফলে বহু দেশ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূমির অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
বিমান হামলার জন্য যে বৈশ্বিক ক্ষোভকে তিনি দায়ী করছেন, তার জবাবে গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহু বলেছিলেন যে, ইসরাইল ইতোমধ্যে সাতটি ফ্রন্টের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটি ‘অষ্টম ফ্রন্টের’ বিরুদ্ধেও লড়ছে।
আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক নেতানিয়াহুর এই আক্রমণ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে আল জাজিরা ও এর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের ‘দীর্ঘমেয়াদি নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের’ আরেকটি নজির বলে অভিহিত করেছে। গাজায় ইসরাইলি হামলায় তাদের ১২ জন সহকর্মী নিহত হয়েছেন।
চ্যাথাম হাউসের সিনিয়র কনসালটিং ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ‘ইসরাইল সরকার (বিমান ছিনতাইয়ের) এই হামলাটিকে জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করতে চাইবে।’
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে মানবাধিকার আইনজীবী দম্পতির ১০ বছরের কারাদণ্ড
তিনি আরও বলেন, ‘এটি ইসরাইলের অনেকের মনে থাকা নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি এবং ৭ অক্টোবরের পর থেকে বয়ে বেড়ানো মানসিক ট্রমার আগুনে ঘি ঢালবে। সেই সঙ্গে যেসব দেশ ইসরাইলকে ধ্বংস করার অভিপ্রায় রাখা পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে শাস্তি দিচ্ছে, সেই দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতি নিয়ে ইসরাইলিদের মনে যে ক্ষোভ রয়েছে, তাকেও এটি আরও উসকে দেবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন