০৯:০৪ পি.এম
আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী এবং তাদের সহযোগী তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা শনিবার মালিজুড়ে নতুনভাবে সমন্বিত হামলা পরিচালনা করেছে। কয়েক মাস আগে একই ধরনের হামলায় দেশটির সামরিক জান্তাকে বড় আঘাত দেওয়ার পর এটি তাদের আরেকটি বড় আক্রমণ।
বামাকো থেকে এএফপি জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ৫টার দিকে (গ্রিনিচ সময় ০৫০০) শুরু হওয়া এ হামলায় উত্তরাঞ্চলের গাও, আনেফিস ও আগেলহক শহর, মধ্যাঞ্চলের সেভারে শহর এবং রাজধানীর কাছে কেনিয়েরোবার একটি কারাগার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে আল-কায়েদা-ঘনিষ্ঠ জেএনআইএম (জামাআত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন) এবং তুয়ারেগ এফএলএ (আজাওয়াদ মুক্তি ফ্রন্ট) উত্তরাঞ্চলের কৌশলগত শহর কিদাল দখল করে এবং মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে হত্যা করে।
আরও পড়ুন: লুলার জয়, ট্রাম্পের জন্য বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধাক্কা
২০২০ ও ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর ইতোপূর্বে মালি সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। ক্ষমতা দখলের সময় সামরিক নেতৃত্ব দেশটিতে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে বিস্তীর্ণ মরুভূমি অধ্যুষিত এ দেশটি জঙ্গি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতায় জর্জরিত হয়ে আছে।
২৫-২৬ এপ্রিলের বড় হামলার পর মালির সেনাবাহিনী, রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত আফ্রিকা কোরের সহায়তায় সামরিক অভিযান জোরদার করে।
প্রায় এক বছর আগে তুয়ারেগ এফএলএ এবং জেএনআইএম একসাথে জোটবদ্ধ হয়। এরপর থেকে তারা যৌথভাবে সামরিক সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
ডাকারভিত্তিক টিম্বুক্তু ইনস্টিটিউটের পরিচালক বাকারি সাম্বে এএফপিকে বলেন, ‘বৃহত্তর আক্রমণের আগে মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে পরিচালিত এসব অভিযান সরকারের দুর্বলতা ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে।’
আরও পড়ুন: এবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অগ্নিকাণ্ড
মালির সেনাবাহিনী শনিবার সকালে ফেসবুকে এক বিবৃতিতে চারটি শহর ও কেনিয়েরোবার ওপর হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, ‘হামলাগুলো শক্ত হাতে প্রতিহত করা হয়েছে’ এবং ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
তবে এএফপির সাথে কথা বলা বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, দুপুর পর্যন্তও কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষ চলছিল।
এফএলএ-এর মুখপাত্র মোহামেদ এলমাউলুদ রমাদানে এএফপিকে বলেন, আনেফিসে ‘বেশ কয়েকটি অবস্থান’ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে শনিবার সকাল পর্যন্ত সেখানে লড়াই চলছিল।
আনেফিসের এক বাসিন্দা জানান, ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শহরের ভেতরে রয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনী এখনো প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। সেনা শিবির এখনও দখল হয়নি।’
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে সুপারি বাগানে মাদক ব্যবসায়ীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার
এপ্রিলের হামলার পর উত্তরাঞ্চলের কিদাল অঞ্চলে আনেফিস ও আগেলহকই বর্তমানে শেষ দুটি এলাকা, যেখানে মালির সেনাবাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর গাওয়ের বাসিন্দারা জানান, সেনা ঘাঁটির কাছে গুলির শব্দ এবং বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
সন্ত্রাসবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক একাডেমির কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষক এএফপিকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে তাদের লক্ষ্য সম্ভবত উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং তারপর আরও দক্ষিণে অগ্রসর হওয়া।’
মধ্যাঞ্চলের সেভারে শহরে, যেখানে একটি বড় সেনা ঘাঁটি এবং বিমানবন্দর রয়েছে, স্থানীয় এক নিরাপত্তা সূত্র জানাচ্ছে, ‘সকাল ৫টার দিকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর পর কয়েকটি যুদ্ধবিমান এলাকাটির ওপর দিয়ে উড়তে দেখা যায়।’
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় মোটরসাইকেল ছাড়াতে গিয়ে ভুয়া সিআইডি কর্মকর্তা আটক
রাজধানী বামাকো থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কেনিয়েরোবা কারাগার কমপ্লেক্সেও হামলা চালানো হয়। সেখানে জঙ্গিসহ বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত বন্দিদের রাখা হয়।
এক বন্দি এএফপিকে বলেন, ‘আমরা বিছানার নিচে লুকিয়ে আছি। এখনো গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।’ এরপরই তার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কেনিয়েরোবা কেন্দ্রীয় কারাগার মালির সবচেয়ে বড় আধুনিক কারাগার, যেখানে আড়াই হাজারের বেশি বন্দি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট
আরও পড়ুন: পাঠ্যবইয়ে দাঁড়িপাল্লার ছবি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এনসিটিবির ৯ কর্মকর্তা বদলি
২০১২ সাল থেকে আল-কায়েদা এবং তথাকথিত ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী, বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কারণে মালি গুরুতর নিরাপত্তা সংকটে রয়েছে।
এপ্রিলের যৌথ হামলায় তুয়ারেগ বিদ্রোহী এবং জঙ্গিরা কিদাল পুনর্দখল করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে মালির সেনাবাহিনী এবং রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপ শহরটি দখল করেছিল। পরে ওয়াগনারের স্থলাভিষিক্ত হয় আফ্রিকা কোর।
জান্তাপ্রধান জেনারেল আসিমি গোইতা রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স থেকে দূরত্ব তৈরি করেছেন।
গত মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, এপ্রিলের হামলার পর বিদ্রোহী গোষ্ঠী, মালির সেনাবাহিনী এবং তাদের রুশ মিত্ররা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন’ করেছে।
আরও পড়ুন: ধামইরহাটে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতার আহ্বান
২০১২ সালের সংকটে তুয়ারেগ বিদ্রোহীরা জঙ্গিদের সঙ্গে মিলে উত্তর মালির গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখল করেছিল।
ঐতিহাসিকভাবে যাযাবর তুয়ারেগ জনগোষ্ঠী মালি, নাইজার, আলজেরিয়া, লিবিয়া এবং বুরকিনা ফাসো জুড়ে বিস্তৃত। দীর্ঘদিন ধরে তারা বঞ্চনার অভিযোগ তুলে সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে আসছে, যার কেন্দ্র ছিল বিশেষ করে কিদাল।
এদিকে জেএনআইএম গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানী বামাকোগামী জ্বালানিবাহী ট্যাংকার বহরে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে আসছে। এই হামলা গত অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন