০৮:৫৮ এম
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় এবার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষকে এরই মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দায়ী মােদের ৭২ ঘণ্টা (আগামী ৭ জুন বিকেল ৪টা পর্যন্ত) সময় বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে উত্তর দেওয়ার জন্য। যদি তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপযুক্ত জবাব দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেতে পারে!
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পরিচালক স্বাক্ষরিত শোকজ লেটারে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, গত ২৭ মে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজের’ বিধান লঙ্ঘন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না?
পত্র জারি হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালটির মালিক ডা. শেখ মহিউদ্দিনকে এই নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ২ বছরের বেতনবৃদ্ধি স্থগিত, ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৭টি প্রমাণিত
চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনার পর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশে ১ জুন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটিকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকালে কমিটি হাসপাতালের ডিজি, এডি, শিশু বিভাগের প্রধান, এনআইসিইউতে কর্মরত চিকিৎসক, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত নার্স, আয়া এবং রোগী ও রোগীর অ্যাটেনডেন্টসহ মৃত নবজাতকদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য গ্রহণ করে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল পরিচালনায় ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ অধ্যাদেশের বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। উক্ত নিয়মের চরম অবহেলার কারণেই ওই ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে কমিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী সাব্যস্ত করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি উক্ত অধ্যাদেশের ৮ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধিত। তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলায় ধারা মোতাবেক কেন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হবে না, তার যৌক্তিক কারণ আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে বা লিখিতভাবে জানানোর জন্য আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: রিজভী: গ্যারান্টি ক্লজের অভাবে তিস্তার পানি পায়নি বাংলাদেশ
উল্লেখ্য, গত ২৭ মে মগবাজারের আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে এক-দুদিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১ জুন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৪ জুন তারা রিপোর্ট জমা দেয়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তদন্তের সারমর্ম তুলে ধরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনটি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। ওই তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ৯০০ বর্গফুটের যে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে নবজাতকদের রাখা হয়েছিল, তা ছিল চারপাশ থেকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ এবং সেখানে কোন বিকল্প ভেন্টিলেশন বা আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছিল না। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত (প্রায় ৫০ জন) মানুষের উপস্থিতিতে রাত ২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এসি বন্ধ থাকায় কক্ষটিতে অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে নবজাতকদের শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটে।
এটি সবসময় খুবই ভয়াবহ ছিল, ঘটনার সময় ওয়ার্ডটিতে কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না এবং শিশুরা মুমূর্ষু অবস্থায় চলে গেলেও নার্সরা কোনো চিকিৎসককে ডাকেননি। নার্সদের দায়িত্বে চরম অবহেলা, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব এবং হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের তীব্র দায়িত্বহীনতা ও ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামোর কারণেই এই দুঃখজনক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
তদন্ত কমিটি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছে। প্রথমত, হাসপাতাল পরিচালনায় ব্যবহৃত ভবনের উপযুক্ততা নিশ্চিতকরণ এবং যত্রতত্র কাচের কক্ষ নির্মাণ বন্ধ করে জরুরি ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স’ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক এবং প্রশিক্ষিত সেবিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীর স্বজনদের অতিরিক্ত উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বোপরি, বেসরকারি হাসপাতালের নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভবন পরিদর্শন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য নীতিগত শর্তারোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ঝালকাঠিতে মা ইলিশ সংরক্ষণে ৭৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল জব্দ
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'আমার আইনে যতটুকু কঠোর (হার্ড) হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাবো। এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না।'
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন