০৯:১৩ এম
ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’-এর প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক বছর আগে যখন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান ডেলিয়া রামিরেজ বিলটি উত্থাপন করেন, তখন তখন তার সহ-উদ্যোক্তা ছিলেন মাত্র ২১ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা। বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ জনে।
ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীরা এই অগ্রগতিকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাদের মতে, কয়েক বছর আগে এমন একটি প্রস্তাব মূলধারার রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য মাসে ভাবা কঠিন ছিল।
বৃহস্পতিবার ক্যাপিটল হিলে এক সংবাদ সম্মেলনে ডেলিয়া রামিরেজ বলেন, “অনেকেই ভেবেছিলেন এই বিলটি খুবই চরমপন্থী উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে এটি এখন অনেক বেশি মূলধারার সমর্থন লাভ করেছে।”
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
যদিও ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে ৭৩ জনের সমর্থন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়, তবুও এটি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রতি বিদ্যমান প্রায় সর্বসম্মত দ্বিদলীয় সমর্থনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
জনমতের পরিবর্তনের প্রতিফলন মেলানোও একটি মূল বিষয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের নির্বাহী পরিচালক মার্গারেট ডিরিউস বলেন, কংগ্রেসে এ ধরনের উদ্যোগের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাহসের ঘাটতিতে ভুগেছে। সেই প্রেক্ষাপটে এটি একটি বড় অগ্রগতি। তবে সামনে এখনও অনেক দীর্ঘ পথ বাকি রয়েছে।”
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন দ্রুত কমছে। ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা মত দিয়েছেন যে, নতুন কোনও শর্ত ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে রামিরেজ প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ভোটাভুটির জন্য উত্থাপনের আহ্বান জানান। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত বিলটির অগ্রগতি আটকে রেখেছে।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিব বলেন, ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন আর রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ কোনও বিষয় নয়। তিনি বলেন, “আমেরিকান জনগণ চায় অর্থ দেশের ভেতরে বিনিয়োগ হোক। তারা মৃত্যু, ধ্বংস আর বোমার পেছনে অর্থ ব্যয় দেখতে চায় না। তারা চায় বিশুদ্ধ পানি, আবাসন, শিশু পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ করা হোক।”
তালিব আরও বলেন, “অনেক মানুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছে, অথচ আমরা মুহূর্তের মধ্যে অর্থ খুঁজে পাই ইসরায়েলকে বেসামরিক জনগণের ওপর বোমা হামলা চালাতে সহায়তা করার জন্য।”
বিলটিতে কী রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করা হলে জানা গেছে, ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’-এ ইসরায়েলের কাছে নির্দিষ্ট ধরনের ভারী বোমা ও গোলন্দাজ অস্ত্রের গোলাবারুদ সরবরাহ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সমর্থকদের দাবি, গাজায় সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর অনেকগুলোতেই এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
বিলটির প্রাথমিক সমর্থকরা মূলত প্রগতিশীল ও ইসরায়েল নীতির সমালোচক আইনপ্রণেতারা ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সমর্থক যুক্ত হচ্ছেন।
২০২৫ সালে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান ভ্যালেরি ফুশি বিলটির সহ-উদ্যোক্তা হন। তিনি বলেন, “গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার আন্তর্জাতিক আইন মেনে অস্ত্র ব্যবহার না হলে আমরা ইসরায়েল সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারি না।”
অন্যদিকে টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ক্রিশ্চিয়ান মেনেফি সম্প্রতি বিলটির সহ-উদ্যোক্তা হয়েছেন। রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসিও এ সপ্তাহে বিলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, ফলে এটি সীমিত পরিসরে হলেও দ্বিদলীয় সমর্থন পেয়েছে।
ম্যাসি বলেন, “ইসরায়েল মার্কিন সরবরাহকৃত অস্ত্র ব্যবহার করে হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে। গাজা ও এর জনগণের ধ্বংসযজ্ঞে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বন্ধ করা নৈতিক দায়িত্ব।”
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
কংগ্রেসে ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। প্রভাবশালী কংগ্রেশনাল প্রগ্রেসিভ ককাসও বিলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান গ্রেগ ক্যাসার বলেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বিক্ষোভ এবং আইনপ্রণেতাদের ওপর নাগরিক চাপই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনও বোমা সরবরাহ করতে পারে না, যা মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর করবে।”
কংগ্রেসওম্যান লাতিফাহ সাইমন বলেন, “এটি কোনও দলীয় বিষয় হওয়া উচিত নয়। একজন আমেরিকান হিসেবে আমাদের স্পষ্টভাবে বলতে হবে- ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্য ও মানবিক সহায়তা বোমার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি যোগ করেন, “শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ যখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, তখন সেই মানবিক সংকটের অর্থায়নে আমাদের ভূমিকা থাকা উচিত নয়। তাই আমি বলছি-বোমা পাঠানো বন্ধ করুন।”
ইসরায়েল নীতিতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ‘ব্লক দ্য বোম্বস অ্যাক্ট’-এর এক বছর পূর্তির সময় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইসরায়েল সম্পর্কিত আরও কিছু উদ্যোগও গতি পাচ্ছে। বুধবার প্রতিনিধি পরিষদে এমন একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে, যার মাধ্যমে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া গত এপ্রিলে সিনেটের ১০০ সদস্যের মধ্যে ৪০ জন- যাদের বেশিরভাগই ডেমোক্র্যাট- ইসরায়েলের কাছে সামরিক বুলডোজার সরবরাহ বন্ধের পক্ষে ভোট দেন।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন জিউইশ ভয়েস ফর পিস (জেভিপি) অ্যাকশনের রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার বলেন, বিলটির প্রতি সমর্থন বাড়লেও তা এখনও যথেষ্ট নয়। তার ভাষায়, “এটি থেকে প্রতীয়মান হয় যে আমাদের সামনে কতটা পথ বাকি। কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য এখনও এমন একটি দেশের কাছে বোমা পাঠানোর পক্ষে, যার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। তাই আমরা কথা বলা বন্ধ করবো না। এখন সময় এসেছে পুরো কংগ্রেসের পদক্ষেপ নেওয়ার। এখন সময় বোমা পাঠানো বন্ধ করার।” সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন