০২:১৪ পি.এম
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছিলেন নায়লা শারাফ। পরে তিনি জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। তার সামনে প্রচলিত অর্থে ভালো বেতন, পদমর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল। তবে এসবের কোনোটিই তাকে ধরে রাখতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত নায়লা শারাফ বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। গত সাত বছর ধরে নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের পড়ানো এবং তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাকেই জীবনের বড় অর্জন মনে করেন এই সাবেক বুয়েট শিক্ষার্থী।
নায়লার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এরপর তিনি বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষ করার পর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু কাজের পরিবেশ এবং কিছু অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন।
আরও পড়ুন: আলীকদমের ৩৮ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই
এরপর তিনি জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে যোগদান করেন। কিন্তু ব্যাংকের চাকরির যান্ত্রিকতা তাকে টানেনি। ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হলেও সেই চাকরিতে যোগদান করেননি। শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন।
উচ্চ বেতন ও সামাজিক মর্যাদার সুযোগ ছেড়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে নায়লা শারাফ বলেন, অর্থ বা খ্যাতির প্রতি তার কোনো মোহ নেই। তিনি অল্পতেই সুখী। নায়লা বলেন, "অর্থ বা খ্যাতির প্রতি কোনো মোহ নেই। আমি সাধারণ জীবন পছন্দ করি। দিন শেষে একটা নিশ্চিন্ত ও পরিতৃপ্তির ঘুম চাই।"
নায়লার পাঠদান শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সত্যবাদী, সাহসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি চেষ্টা করেন। শিশুদের উৎসাহিত করেন যাতে তারা কোনো কাজ সঠিক কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে।
পাঠদানকে আনন্দময় ও সহজ করতে বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরেও কাজ করেন নায়লা। নিজের হাতে ছবি আঁকার পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুত করেন।
আরও পড়ুন: বুটেক্সের অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান খানের মৃত্যুতে উপাচার্যের শোক
নায়লার এই সিদ্ধান্ত স্বজন ও পরিচিত অনেকের কাছে একসময় ‘পাগলামি’ মনে হয়েছিল। তবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং শৈশবে ভিকারুননিসায় যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাও যেন সেই সুযোগ পায়—এটাই তার প্রত্যাশা।
এ প্রসঙ্গে নায়লা বলেন, "অন্য বিভাগে থাকলে হয়তো অনেক টাকার মালিক হতাম, সবাই মেধাবী বলত। কিন্তু এখানে আমি ভালোবাসা পাই। আমি এই ভালোবাসার কাঙাল। বাচ্চারা যখন এসে ভালোবাসা জানায়, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না।"
দেশের মেধাবী তরুণদের প্রাথমিক শিক্ষায় আসার আহ্বান জানিয়ে নায়লা শারাফ বলেন, প্রতিদানের আশা না করে শুধু দেওয়ার মানসিকতা থাকলেই প্রাথমিক শিক্ষায় আসা উচিত। তার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষকতা সম্মানজনক একটি পেশা। বাংলাদেশেও এই পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করা সম্ভব, যদি মেধাবী ও আন্তরিক তরুণেরা এতে এগিয়ে আসেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিক বলেন, "বুয়েটে পড়েও তিনি যেভাবে প্রান্তিক শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়াচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি আমাদের বিদ্যালয়ের অমূল্য সম্পদ।"
আরও পড়ুন: কক্সবাজারের রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত জবি শিক্ষার্থী নাবিলা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন