১১:৫২ পি.এম
স্টেশনে একটি ট্রেন এসে থামল, কিন্তু সেখানে ডিজেল ইঞ্জিনের পরিচিত গর্জন শোনা যাচ্ছে না এবং কালো ধোঁয়ার মেঘও নেই। এই ট্রেনটি চলার জন্য কোনো জ্বালানি পোড়ায় না; বরং এটি বিদ্যুৎ তৈরি করার জন্য একটি নিজস্ব ব্যবস্থা ব্যবহার করে। এর জ্বালানি হলো হাইড্রোজেন, এবং এই পুরো প্রক্রিয়ার একমাত্র সরাসরি উপজাত হলো পানি ও তাপ।
দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেছে। গত ১৭ জুলাই হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত সেকশনে ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন চালিত যাত্রীবাহী ট্রেন ‘নমো গ্রিন রেল’-এর যাত্রা শুরু হয়েছে। ১০টি কোচের এই ট্রেনে দুটি হাইড্রোজেন চালিত ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি যাত্রীবাহী কোচ রয়েছে, যার সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২,৪০০ কিলোওয়াট।
তবে হাইড্রোজেন সরাসরি ট্রেনের চাকা ঘোরাতে সক্ষম নয়। প্রথমে এটিকে ‘ফুয়েল সেল’ নামক একটি যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করতে হয়। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি বোঝার মাধ্যমে পরিষ্কার হবে, কেন হাইড্রোজেন ট্রেনকে ডিজেল লোকোমোটিভের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে, এবং কেন এটি সব রেল রুটের জন্য উপযুক্ত সমাধান নয়।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেন ডেমোক্র্যাট নেতা শুমার
এটি একটি বৈদ্যুতিক ট্রেন, তবে এর নিজস্ব পাওয়ার স্টেশন রয়েছে। হাইড্রোজেন ট্রেনের কার্যপদ্ধতি বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো এটিকে এমন একটি বৈদ্যুতিক ট্রেন হিসেবে ধরে নেওয়া, যার চলার জন্য মাথার ওপরে কোনো বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন প্রয়োজন হয় না।
একটি প্রচলিত বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন সাধারণত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন অথবা কিছু ক্ষেত্রে লাইনের পাশে থাকা ‘থার্ড রেল’ থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ করে। কিন্তু হাইড্রোজেন ট্রেন তার ট্রেনের ভেতরেই নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এটি করা হয় ফুয়েল সেলের মাধ্যমে, যা ট্রেনের ট্যাংকে জমা রাখা হাইড্রোজেনের সাথে চারপাশের বাতাস থেকে নেওয়া অক্সিজেনের মিশ্রণ ঘটায়।
ফুয়েল সেলের ভেতরে হাইড্রোজেনের অণুগুলো প্রোটন এবং ইলেকট্রনে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রোটনগুলো একটি বিশেষ মেমব্রেন বা পর্দার মধ্য দিয়ে সরাসরি পার হতে পারে, কিন্তু ইলেকট্রনগুলো তা পারে না। ফলে ইলেকট্রনগুলোকে একটি বাহ্যিক সার্কিট বা পথ ঘুরে আসতে হয়। আর ইলেকট্রনের এই প্রবাহই বিদ্যুৎ তৈরি করে।
ফুয়েল সেল থেকে যে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তা সরাসরি ট্রেনের মোটরে পাঠানো হয়। এই মোটরগুলোই ট্রেনের চাকা ঘুরিয়ে ট্রেনটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি যেহেতু একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া, তাই এখানে কোনো জ্বালানি পোড়ানো হয় না। ফলে ক্ষতিকারক ধোঁয়ার বদলে ট্রেনের সাইলেন্সার দিয়ে কেবল বিশুদ্ধ জলীয় বাষ্প (পানি) এবং সামান্য তাপ বা গরম হাওয়া বাইরে বের হয়।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধের কারণেই নির্বাচনে পরাজয়: ট্রাম্পের পর ভ্যান্সের স্বীকারোক্তি
সহজ কথায়, এই প্রক্রিয়াটিকে এভাবে দেখানো যায়—হাইড্রোজেন + অক্সিজেন => বিদ্যুৎ + পানি + তাপ। এই ট্রেনে সাধারণ ইঞ্জিনের মতো আগুন জ্বালিয়ে বা হাইড্রোজেন পুড়িয়ে শক্তি তৈরি করা হয় না। বরং, ফুয়েল সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে হাইড্রোজেনের ভেতরের রাসায়নিক শক্তিকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত করা হয়। যেহেতু এই বিদ্যুৎ দিয়েই ট্রেনটি চলে, তাই মাথার ওপরে কোনো বৈদ্যুতিক তার না থাকলেও এটি আসলে পুরোপুরি একটি বৈদ্যুতিক ট্রেন।
ট্রেনের জন্য ব্যাটারির প্রয়োজন কেন?
ফুয়েল সেল যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তবে ট্রেনের আলাদা করে ব্যাটারির প্রয়োজন কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ট্রেনের শক্তি ব্যবহারের ধরনের ওপর। ট্রেন চলার সময় প্রতি মুহূর্তে একই পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করা, গতি বাড়ানো, ঢালু বা উঁচুতে ওঠা এবং একটি নির্দিষ্ট গতিতে চলতে থাকার সময় প্রোপালশন সিস্টেমের কাছে শক্তির চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হয়।
একটি ফুয়েল সেল সাধারণত স্থির এবং একটানা বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করে। অন্যদিকে, যখন হঠাৎ করে শক্তির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, তখন ব্যাটারি সেই অতিরিক্ত শক্তির জোগান দিতে পারে। ভারতের এই হাইড্রোজেন ট্রেনে ফুয়েল সেলের পাশাপাশি লিথিয়াম ফেরো ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুটি সিস্টেম একসাথে কাজ করে: ফুয়েল সেলগুলো নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, আর ব্যাটারিগুলো হঠাৎ বেড়ে যাওয়া শক্তির চাহিদা মেটায় এবং অতিরিক্ত শক্তি জমা করে রাখে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধই আমাদের পরাজয়ের কারণ, বললেন জেডি ভ্যান্স
এছাড়াও, ট্রেনটি যখন ব্রেক কষে, তখন পুনরুৎপাদনশীল ব্রেকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে গতিশক্তিকে তাপে নষ্ট হতে না দিয়ে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করে ব্যাটারিতে রিচার্জ করা হয়। ভারতের এই ট্রেনের প্রোপালশন ইকুইপমেন্টগুলো আটটি যাত্রীবাহী কোচের দুই প্রান্তে থাকা দুটি ড্রাইভিং পাওয়ার কারে রাখা হয়েছে। প্রতিটির ক্ষমতা ১,২০০ কিলোওয়াট, যার ফলে মোট ক্ষমতা দাঁড়ায় ২,৪০০ কিলোওয়াট।
জিন্দ-সোনিপত রুটে ট্রেনটি সর্বোচ্চ ৭৫ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতিতে চালানোর অনুমতি পেয়েছে, যদিও এর ডিজাইন গতি ১১০ কিমি প্রতি ঘণ্টা।
হাইড্রোজেন কোথা থেকে আসে?
হাইড্রোজেন ট্রেন বাতাস থেকে সরাসরি হাইড্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং রিফুয়েলিংয়ের ব্যবস্থা। হরিয়ানার জিন্দ-এ ভারতীয় রেলওয়ে এই ট্রেনের জন্য হাইড্রোজেন সরবরাহের একটি বিশেষ ফেসিলিটি তৈরি করেছে। এখানে ‘ইলেক্ট্রোলাইসিস’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন তৈরি করা হয়, যেখানে বিদ্যুতের সাহায্যে পানিকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে রূপান্তর করা হয়।
আরও পড়ুন: স্ত্রীর ছবি ফেসবুকে দেয়ায় বন্ধুকে হত্যা, কুয়েতে বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড
এরপর এই হাইড্রোজেন গ্যাসকে সংকুচিত করে বিশেষ ট্যাংকে জমা রাখা হয়। হাইড্রোজেন অত্যন্ত হালকা গ্যাস হওয়ায় এটিকে উচ্চ চাপে সংকুচিত না করলে এটি বিশাল জায়গা দখল করে। জিন্দ-এর এই ফেসিলিটিতে প্রায় ৩,০০০ কেজি হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে গ্যাসটি ৫০০ বার পর্যন্ত উচ্চ চাপে রাখা হয় এবং ট্রেনের ট্যাংকে ৩৫০ বার চাপে রিফুয়েল করা হয়।
এই রিফুয়েলিং প্রক্রিয়াটি সাধারণ গাড়িতে জ্বালানি ভরার মতো মনে হলেও এর চাপ, স্টোরেজ ইক্যুইপমেন্ট এবং নিরাপত্তা বিধি সম্পূর্ণ আলাদা। ট্রেনের অনবোর্ড সিলিন্ডারগুলো এই হাইড্রোজেনকে ফুয়েল সেলে নিয়ে যায়, যা যাত্রাপথে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়।
হাইড্রোজেন তো দহনযোগ্য, এই ট্রেন কতটা নিরাপদ? হাইড্রোজেন অত্যন্ত দহনযোগ্য একটি গ্যাস। বাতাসের সাথে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশলে এটি সহজেই আগুন ধরে যেতে পারে এবং এটিকে অতি উচ্চ চাপে সংরক্ষণ করা প্রকৌশলীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে এর মানে এই নয় যে হাইড্রোজেন পরিবহন অনিরাপদ। এর অর্থ হলো পুরো সিস্টেমটিকে এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যেন কোনো লিক বা ছিদ্র প্রতিরোধ করা যায়, কোথাও লিক হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা যায়। ভারতীয় রেলওয়ে হাইড্রোজেন লিক, তাপ, আগুন এবং ধোঁয়া শনাক্ত করার জন্য ট্রেনে বিশেষ সেন্সর বসিয়েছে। এছাড়াও ট্রেনে রয়েছে উন্নত ভেন্টিলেশন সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ (বন্ধ করার) ব্যবস্থা এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং ইকুইপমেন্ট। এর রিফুয়েলিং ফেসিলিটি সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বিধি মেনে তৈরি এবং এটি পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস সেফটি অর্গানাইজেশন (পিইএসও) দ্বারা প্রত্যয়িত।
আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তনে দক্ষিণ এশিয়ার কাছে চীনের জবাবদিহি জরুরি
গ্যাসটি বিশেষ সিলিন্ডারে রাখা হয় এবং কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইড্রোজেনের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। এই সুরক্ষাকবচগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হাইড্রোজেনের অণুগুলো এতই ছোট যে সামান্যতম ফাঁকফোকর দিয়েও এটি গলে বেরিয়ে যেতে পারে, যা অন্য গ্যাসের ক্ষেত্রে সাধারণত হয় না। তাই চ্যালেঞ্জটি কেবল আগুন প্রতিরোধ করা নয়, চ্যালেঞ্জটি হলো কোনো লিক হলে যেন বিপজ্জনক মাত্রায় হাইড্রোজেন জমা হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা যায়।
হাইড্রোজেন ট্রেন কি আসলেই সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত? একটি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ট্রেন যখন চলে, তখন এর প্রোপালশন প্রক্রিয়া থেকে কোনো কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হয় না। ডিজেল ইঞ্জিনের মতো ক্ষতিকারক ধোঁয়ার পরিবর্তে এর একমাত্র সরাসরি উপজাত হলো পানি।
তবে ট্রেন থেকে কী নির্গত হচ্ছে এবং সেই জ্বালানি তৈরি করতে গিয়ে কতটা কার্বন নির্গমন হচ্ছে—এই দুটির মধ্যে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। হাইড্রোজেন কিন্তু সূর্যালোক বা বাতাসের মতো প্রকৃতিতে সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী শক্তি হিসেবে পাওয়া যায় না। এটিকে অন্য কোনো শক্তির উৎস ব্যবহার করে তৈরি করতে হয়। পানি ভাঙার জন্য যে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, তা যদি সৌর বা বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, তবেই সেই হাইড্রোজেনকে ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ বলা যায়।
কিন্তু যদি হাইড্রোজেন তৈরিতে জীবাশ্ম জ্বালানি (যেমন কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাস) ব্যবহার করা হয়, তবে এর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হবে। তাই একটি হাইড্রোজেন ট্রেন পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী, তা আংশিকভাবে নির্ভর করে হাইড্রোজেনটি কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কীভাবে তা পরিবহন করা হচ্ছে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় কতটা শক্তি ব্যয় হচ্ছে তার ওপর। সহজ কথায়, চলার সময় কেবল জলীয় বাষ্প ছড়ালেই একটি ট্রেন তার সম্পূর্ণ এনার্জি সাপ্লাই চেইনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্বন-মুক্ত হয়ে যায় না।
আরও পড়ুন: ইরানে পারমাণবিক হামলা হলে জ্বলবে পুরো বিশ্ব! মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন ও কোরীয় উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়তে পারে যুদ্ধের ভয়াবহতা
কেন সব ডিজেল ট্রেনকে হাইড্রোজেন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে না? প্রথাগত বৈদ্যুতিক ট্রেনের (বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন) চেয়ে হাইড্রোজেন ট্রেন কিন্তু কোনো ভালো বিকল্প নয়। যে রুটগুলোতে ইতিমধ্যেই ওভারহেড লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুতায়ন করা আছে, সেখানে বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করাটাই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও দক্ষ। কারণ বিদ্যুৎকে হাইড্রোজেনে রূপান্তর করা, তা সংকুচিত করে জমা রাখা এবং আবার ট্রেনের ভেতরে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর করার পুরো চক্রটিতে শক্তির অনেক অপচয় হয়।
আর এই কারণেই এই প্রযুক্তিটি বিশেষ করে এমন সব রুটের জন্য প্রাসঙ্গিক, যেখানে ওভারহেড তার বসানো অত্যন্ত কঠিন বা ব্যয়বহুল—যেমন কিছু আঞ্চলিক এবং কম ব্যবহৃত রেললাইন। ভারতীয় রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, তারা ইতিমধ্যে তাদের ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের ৯৯ শতাংশেরও বেশি বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন করেছে। এর মানে হলো, হাইড্রোজেন ট্রেনকে পুরো বৈদ্যুতিক রেল ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করার জন্য আনা হচ্ছে না। এর ভূমিকা অত্যন্ত নির্দিষ্ট: যেসব দুর্গম বা বিশেষ সেকশনে পূর্ণ বিদ্যুতায়ন বাস্তবসম্মত নয়, সেখানে ডিজেল ইঞ্জিনের একটি পরিবেশবান্ধব বিকল্প গড়ে তোলা।
এছাড়াও গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের খরচ, এই বিশেষায়িত ট্রেনের উচ্চ মূল্য, রিফুয়েলিং স্টেশন নির্মাণের ব্যয় এবং জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহের মতো বিষয়গুলো এখনো বড় প্রশ্ন। এই অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর ওপরই নির্ভর করবে এই প্রযুক্তিটি পাইলট রুট ছাড়িয়ে আরও ডানা মেলতে পারবে কিনা।
এরপর কী হতে যাচ্ছে?
ভারতের এই প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনটির মূল উদ্দেশ্য হলো—এ দেশের রেলওয়ের নিজস্ব পরিস্থিতির মধ্যে এই প্রযুক্তিটি আদৌ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে কিনা, তা প্রমাণ করা। এই প্রকল্পটি কেবল একটি ট্রেনের ট্রায়াল বা পরীক্ষা নয়; বরং এর মাধ্যমে হাইড্রোজেন উৎপাদন, সংরক্ষণ, সংকুচিত করা এবং তা ট্রেনে রিফুয়েল করার জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে রেলওয়ে জানায় যে, উদ্বোধনের পর থেকে ট্রেনটি ইতিমধ্যে ১,২০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে, যা ৩,২০০ লিটারেরও বেশি ডিজেল সাশ্রয় করেছে। রেলওয়ে আরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা অন্যান্য রুটেও হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন চালু করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সাহায্য করবে। এর মধ্যে কালকা-শিমলার মতো ঐতিহাসিক পাহাড়ি হেরিটেজ সেকশনগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রযুক্তিটি এখনও বিকাশের স্তরে রয়েছে। এর ব্যাপক ব্যবহার মূলত ট্রেনের পরিচালনগত নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি খরচ, নিরাপত্তা এবং প্রকৃত অর্থেই কম-কার্বনযুক্ত (শতভাগ গ্রিন) হাইড্রোজেনের সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করবে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে ট্রেনের শক্তি পাওয়ার ধরনের ক্ষেত্রে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রেল যোগাযোগ মূলত দুটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে চলেছে—অনবোর্ড জ্বালানি পোড়ানো (ডিজেল ইঞ্জিন) অথবা বাইরে থেকে বিদ্যুৎ টেনে নেওয়া (বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন)। হাইড্রোজেন ট্রেন এবার একটি তৃতীয় ব্যবস্থার দুয়ার খুলে দিল: এমন একটি জ্বালানি সাথে নিয়ে চলা, যা ট্রেন চলার সময় ট্রেনের ভেতরেই বিদ্যুতে রূপান্তরিত হতে পারে।
ভারতীয় রেল ট্র্যাকে এটি একটি সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠবে কিনা—তা কেবল ট্রেনটি কত ভালো চলছে তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং দেশটি ট্রেনটি সচল রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সাশ্রয়ী এবং কম-দূষণকারী হাইড্রোজেন তৈরি করতে পারছে কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন