০৩:৩৫ পি.এম
নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা এবং ভূমিধসের পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার হাজার হাজার নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সুনামির মতো প্রবল স্রোত, কাদা এবং ধ্বংসাবশেষের ঢলে একাধিক গ্রাম তলিয়ে গেছে।
এএফপি’র খবর অনুযায়ী, দুই দেশের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শনিবার নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত ৬৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া, কিছু মরদেহ নেপালের নদীর স্রোতে ভেসে ভারতের অনেক দূর পর্যন্ত চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্পের উপস্থিতিতে, নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নতুন করে নিখোঁজের তালিকায় ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর নাম যুক্ত করেছে। এর আগে ওই তালিকায় ট্রেকার এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
যারা এই দুর্যোগ থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তারা জানিয়েছেন যে, তারা প্রায় সবকিছু হারিয়েছেন। এখন তারা নিখোঁজ স্বজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, সেই উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। একই সঙ্গে, শূন্য থেকে নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তারা।
বন্যায় বেঁচে যাওয়া বুদ্ধি রাম দাঙ্গোল এএফপিকে বলেন, ‘নদীর কাছের সব বসতি ভেসে গেছে। সেখানে এখন আর কিছুই নেই।’
সামঝানা থিং জানান, নিখোঁজ ভাইয়ের কোনো খবর পাওয়ার আশায় তিনি তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই জানি না। আশা করছি, সে নিরাপদ কোনো জায়গায় আছে।’
‘ভয়াবহ’ মানসিক আঘাত
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
রেড ক্রস জানিয়েছে, বুধবারের এই ভয়াবহ দুর্যোগে মানুষের ওপর ব্যাপক মানসিক ও শারীরিক আঘাত নেমে এসেছে। এতে ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে জীবিতদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত কাজ করছে। তবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক এলাকায় খাবার ও পানির সরবরাহ ফুরিয়ে আসছে।
নিখোঁজদের উদ্ধারে তৎপরতার মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রচণ্ড স্রোতে বরফ ও কাদা জমে বিভিন্ন স্থানে বিশাল জলাধারের মতো পানি জমেছে। এর মধ্যে একটি জলাধার এখন সেখানে নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করা উদ্ধারকর্মীদের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের পুলিশ সব উদ্ধারকর্মীকে ‘অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, তিব্বত প্রান্তে আবারও একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত এবং সেখানে চীনা কর্তৃপক্ষই মূলত তথ্য দিচ্ছে। নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় চীনের উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতির ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া শনিবার ভোরে জানিয়েছে, ওই এলাকায় দুই গ্রামবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল সীমান্তের দিকে ত্রিশূলী-৩ এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে কয়েকজন মানুষ আটকা পড়েছেন বলে শনাক্ত করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। তাদের উদ্ধারে সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত এএফপিকে বলেন, ‘দুটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। তবে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলোই ঠিকমতো শনাক্ত করা কঠিন।’
আরও পড়ুন: বোম্বে হাইকোর্ট ইমরান খানের ভারত ছাড়ার নোটিশ স্থগিত করেছে
তিনি জানান, ওই এলাকা থেকে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে একই এলাকায় আটকা পড়া আরও শতাধিক মানুষকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ত্রিশূলী উপত্যকার অন্যান্য বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা জানিয়েছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বুদ্ধ তামাং এএফপিকে বলেন, বন্যার সময় তিনি কর্মস্থলের একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় সেখানে আটকা থাকার পর বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টারে করে তাকে উদ্ধার করা হয়। তামাং বলেন, ‘অন্য পাশে কাজ করা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবাই ভেসে গেছেন।’
শুক্রবার নেপাল জানিয়েছে, দেশটিতে বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ১ হাজার ৯২৪ জনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। এর আগে নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ৯৭৭।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে তারা সাতটি মরদেহ উদ্ধার করেছে। এসব মরদেহ বন্যায় ভেসে যাওয়া ব্যক্তিদের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৈলাস তীর্থযাত্রার পথে বিপর্যয়
নেপাল-চীন সীমান্তে নিখোঁজদের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। তাদের অনেকেই তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন।
আরও পড়ুন: সাঈদীর মামলার বাদীকে দাফনে বাধা দেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন জামায়াতের
৪৬ বছর বয়সী শিবরঞ্জনী মুথুনাথান ৫৬ জনের সঙ্গে একটি বাসে করে চীনের সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তারা যানজটে আটকে পড়েছেন বলে মনে করেছিলেন।
মুথুনাথান শুক্রবার এএফপিকে বলেন, ‘এরপর কুয়াশা, ধোঁয়া—এমন কিছু একটা আমাদের হঠাৎ ঘিরে ফেলল।’ এ সময় তিনি নিজের মোবাইলে ধারণ করা পানির প্রবল স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে আসার একটি ভিডিওও দেখান।
তাদের চারপাশে গাড়িগুলো পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল এবং কাদার নিচে চাপা পড়ছিল।
তিনি বলেন, ‘একজন একজন করে আমরাও চালকের পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসি। এরপর দৌড়ে একটি পাহাড়ের ওপর উঠে যাই।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন