০৭:২৯ পি.এম
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সংকটের কারণে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, চালু থাকা কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। ২০টির মধ্যে অন্তত ৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতোমধ্যে বন্ধ থাকলেও, সীমান্ত পেরিয়ে প্রতি দিন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। তবুও খুলনা-বরিশালসহ পদ্মার এপারের ২১ জেলার মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করছে।এই অঞ্চলে উৎপাদিত ও আমদানি করা বিদ্যুতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে ঢাকা এবং অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ করা হয়। ফলে, যদিও রোগা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, তবুও এখানকার বাসিন্দাদের অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে।স্থানীয় নাগরিক নেতারা অভিযোগ করছেন, এটি শুধু উৎপাদনের অভাব নয়, বরং দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বণ্টনে বৈষম্যের আরেকটি উদাহরণ।ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি (ওজোপাডিকো) থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গ্যাস স্বল্পতার কারণে ৪১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভেড়ামারা নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার প্লান্ট কয়েকদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ১১৫ মেগাওয়াটের খুলনা কেপিসিএল, ২২৫ মেগাওয়াটের নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার প্লান্ট, ১০৫ মেগাওয়াটের রূপসা ওরিয়ন পাওয়ার প্লান্টসহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। পাশাপাশি, চালু থাকা কেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগ তাদের সক্ষমতার নিচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।ওজোপাডিকোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার খুলনা পাওয়ার প্লান্ট মাত্র ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করেছে। এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন করেছে ৫১০ মেগাওয়াট এবং ১৫০ মেগাওয়াটের পায়রা ইউনাইটেড পাওয়ার প্লান্ট থেকে এসেছে মাত্র ১৭ মেগাওয়াট।৫০০ মেগাওয়াটের খুলনা পাওয়ার প্লান্ট থেকেও উৎপাদন এসেছে ৮৫ মেগাওয়াট। ওই দিন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কেন্দ্রগুলো থেকে মোট ৪,৪১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও, ওজোপাডিকোর গ্রাহকদের জন্য মাত্র দুই হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট সরবরাহ করা হয়েছে, বাকী দুই হাজার ১০৪ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়েছে।এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় নাগরিক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, কারণ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো এখানে অবস্থিত হলেও এখানকার জনগণ পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় লোড ডেসপাস সেন্টার (এলডিসি) বিদ্যুৎ বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করছে, তাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি উঠছে।ওজোপাডিকো এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একাধিক সূত্র জানায়, খুলনা ও বরিশাল জোনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। দুই জোনের চাহিদা ৬০০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট হলেও, সরবরাহ ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াটের ঘাটতিতে রয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় দিনে আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল এবং ভিআইপি ফিডারের বাইরের এলাকায় লোডশেডিং বেশি দেখা যাচ্ছে।এদিকে, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব পড়ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ, আইটি সেবা, হাসপাতাল এবং উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কার্যত অর্ধেক সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ জানান, 'ওজোপাডিকো কেবল বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান। এলডিসির মাধ্যমে পিডিবি থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তা-ই বিতরণ করা হয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হলে কিছু এলাকায় লোডশেডিং করতেই হয়। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।'বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান অভিযোগ করেছেন, খুলনা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। এখানে যথেষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও তার বড় অংশ অন্য অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। যার কারণে স্থানীয় জনগণকে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে। অপরদিকে, পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, 'খুলনা সিটি করপোরেশনের সোনাডাঙ্গা সোলার পার্কটি অল্প ব্যয়ে সচল করা হলে স্থানীয়ভাবে কিছু বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সরকারি উদ্যোগ নিলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন