০৪:১৬ পি.এম
উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে দুই দেশের মধ্যে কার্যকরভাবে চলমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী আইআরজিসি শনিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রতিশোধে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্টকম জানায়, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার অবস্থানের ওপর হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানী ড্রোন হামলার জবাবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলরত একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে।
আরও পড়ুন: মালদ্বীপের স্পিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, আলোচনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে
সেন্টকম-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানি বাহিনীর এই হামলা বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের বিরুদ্ধে ‘অযৌক্তিক আগ্রাসন’ এবং এটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সিরিক বন্দরে বিস্ফোরণ হয়েছে, তবে ক্ষয়ক্ষতির দাবি নাকচ করেছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানাচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক বন্দরের তাহেরুই জেটি এলাকায় শুক্রবার গভীর রাতে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার ফলে বিস্ফোরণটি ঘটেছে। তবে রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ মেহের নিউজ এজেন্সি দাবি করেছে, সিরিক বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং সেখানে কোন স্থাপনা বা যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, এটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘একটি বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’। এরপর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, “ইরান যদি আরও হামলা চালায়, তাহলে সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।”
এর কিছুক্ষণ পরেই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আইআরজিসির বিবৃতি প্রচার করা হয়। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি আরও হুঁশিয়ারি দেয়, “আগ্রাসন যদি আবারও ঘটে, তাহলে আমাদের জবাব এবারের চেয়েও ব্যাপক হবে।”
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দশম স্থলবাহিনী সংলাপ ঢাকা সেনানিবাসে সফলভাবে সম্পন্ন
সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষে গত ১৭ জুন ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কি কার্যকর থাকবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তিটি মূলত একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা, যার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়।
ইরান এর আগে জানিয়েছে যে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে উপসাগরে প্রবেশ বা নিষ্ক্রমণ করতে পারবে না। তবে বাস্তবে অনেক জাহাজ বিকল্প পথ ব্যবহার করে চলাচল অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে, সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’ বৃহস্পতিবার হামলার শিকার হয়ে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক বোমাবর্ষণও আঞ্চলিক সমঝোতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শুক্রবার ইসরায়েল ও লেবানন একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা ওয়াশিংটনের ভাষায় দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে যদি কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা ঘটে, তবে তা অবশ্যই একটি শক্তিশালী যাচাই ব্যবস্থার আওতাধীন হতে হবে। গ্রোসি বলেন, “ইরান সরকার স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তাদের লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা নয়। কিন্তু শুধু ঘোষণাই যথেষ্ট নয়।” কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
অন্তর্বর্তী সমঝোতা অনুযায়ী, যুদ্ধের পূর্বে ইরানের কাছে থাকা প্রায় ৪৪০ কেজি, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে নিম্ন মাত্রায় সমৃদ্ধ করার কথা উল্লেখ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা সংকট এবং পারমাণবিক বিষয়ক আলোচনা - এই তিনটি বিষয়ই বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সূত্র: আল-জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন