০৯:৪২ এম
জন্ম থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী একটি মেয়ে। তার ভ্যানচালক বাবা মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য শহর থেকে গ্রামে ঘুরেছেন। কিন্তু কোনো স্কুলই মেয়েটিকে ভর্তি নিতে রাজি হয়নি। উপায় না পেয়ে, বাবার মনে মেয়ের করুণ অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা উঠে আসে এবং তিনি তার নিজ গ্রামে একটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে সেখানে দুই শর বেশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শিক্ষার আলো পাচ্ছে। বিদ্যালয়ে স্বেচ্ছায় শ্রম দিচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। ভ্যানচালক সেলিম মিয়ার এমন উদ্যোগটি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে।
সরেজমিনে মাদারীপুরের রাজৈরের প্রত্যন্ত এলাকা শাখারপাড়ে দেখা যায়, গ্রামটির মেঠোপথ ধরে দলবদ্ধ হয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে কেউ ১২ বছর বয়সী, আবার কেউ ১৫ বছর। তারা বিদ্যালয়ে এসে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে যোগ দিচ্ছে। প্রতিদিন এই ধরনের দৃশ্য বিদ্যালয়ে ফুটে ওঠে।
২০১৮ সালে ভ্যানচালক সেলিম মিয়া এই প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। দুই বছর পর, তিনি নিজ অর্থায়নে ২০ শতাংশ জমি কিনে একটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেন। প্রথম দিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকলেও বর্তমানে বিদ্যালয়ে দুই শতাধিক প্রতিবন্ধী শিশু লেখাপড়া করছে। এখানে ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী স্বেচ্ছায় শ্রম দিচ্ছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি নকশিকাঁথা, মোমবাতি ও এলইডি বাল্ব তৈরি এবং সেলাই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
আরও পড়ুন: হোটেলে নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ বিক্রির অভিযোগে মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
জানা যায়, শাখারপাড় গ্রামের মোশারফ শরীফের ছেলে সেলিম মিয়া। তার বড় মেয়ে মরিয়ম আক্তারকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য শহর থেকে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন। তবে কোথাও ভর্তি করার সুযোগ পাননি। মানসিক কষ্ট সত্ত্বেও, তিনি অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াতে নিজেই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বিদ্যালয়ে ভর্তির পর সন্তানদের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখে অভিভাবকরা আনন্দিত। বেশ কয়েকজন অভিভাবক জানান, বিদ্যালয়ে আসার পর তাদের সন্তানদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে তারা কারো সঙ্গে মেশে না, কিন্তু এখন খেলাধুলা করে এবং কথা বলে। বাসায় একা থাকতে ভয় পেত, সেই ভয়টিও এখন দূর হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সেলিম মিয়া জানান, ‘ইচ্ছেশক্তি আর মনোবল থাকার কারণেই এই বিদ্যালয়টি স্থাপন করতে পেরেছি। প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে এখন সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। এখানে দায়িত্ব পালন করা কোনো শিক্ষক-কর্মচারী বেতন পান না। তারা পরিবার নিয়ে আছেন। সরকার যদি আমাদের দিকে নজর দেয়, তাহলে বিদ্যালয়টি আরও সাফল্য অর্জন করতে পারবে।’
সহকারী শিক্ষক তাপসী আক্তার বলেন, ‘আমি ৬ বছর ধরে বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে কাজ করছি। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু নজর দিত, তাহলে আমাদের কষ্ট কিছুটা হতো।’
আরও পড়ুন: পুলিশ: ঢাল-লাঠি দিয়ে প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জনকে হত্যা
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাদিজা আক্তার জানান, ‘বাচ্চাদের বিনা বেতনে এখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের খরচও বিদ্যালয় থেকে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠান আর এটি চালাতে পারছে না। সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ ও জাতীয়করণ না হলে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
জানা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অনলাইনে আবেদন করা হলেও, তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।
এ বিষয়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে বেশ কিছু শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে বিদ্যালয়ের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি জানতে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট আসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিদ্যালয়টির কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসন তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করবে। পাশাপাশি এটি এমপিওভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নেওয়া হবে।’
আরও পড়ুন: কোনাবাড়িতে পানি ফ্যাক্টরি ও ঝুট গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন