০৪:০৫ পি.এম
মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বয়ারচর ক্রমেই বিক্ষত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বয়ারচরের গাবতলী স্লুইসগেইট এলাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নদীর ভাঙনে একের পর এক ঘরবাড়ি, দোকানপাট, সড়ক ও স্থাপনা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে বদলে যাচ্ছে জনপদের চিত্র।
ভাঙন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নদীপারের মানুষ। তাদের দাবি, নদীভাঙন থেকে বয়ারচরকে রক্ষা করতে দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে নদীর জোয়ারের সময় মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর পানি বাড়লে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ে। কোথাও নদীর পাড় ধসে পড়ছে, কোথাও বসতভিটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। গত বছরও বয়ারচরের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙনে বহু ঘরবাড়ি ও স্থাপনা বিলীন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, বয়ারচরের দক্ষিণে ভুলুয়া নদী এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী অবস্থিত। দুই নদীর মাঝে থাকা জনপদ হওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকি যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ভাষ্য, নদী দুটির গতিপথ ও পানির প্রবল স্রোতের কারণে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের শিকার হচ্ছে, ফলে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাস-সিএনজির সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নিহত, আহত ৪
রামগতি চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার এই চরটি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার হরণী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী, যা মেঘনা ও ভুলুয়া নদীবেষ্টিত। মেঘনার বুকে পলি জমে জেগে ওঠা এ চরে একসময় ছিল নদী ও চরাঞ্চলের নিঃসঙ্গ জনপদ। সময়ের পরিক্রমায় সেই ভূমিতে মানুষের বসতি, কৃষি, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু যে নদী থেকে এসব চর সৃষ্টি হয়েছে, সেই মেঘনা ও পাশের ভুলুয়া নদীই এখন বয়ারচরের জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। পলি জমে যে ভূমির জন্ম, নদীভাঙনে সেই ভূমিই আবার হারিয়ে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, বয়ারচরের ইতিহাস একটা দিকে নতুন ভূমি সৃষ্টির, অন্যদিকে সেই ভূমি রক্ষার নিরন্তর সংগ্রামের। এ চরে বর্তমানে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস রয়েছে।
২০০২ সালে সিডিএসপি ২ প্রকল্পের আওতায় বয়ারচরের উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয় এবং ২০০৫ সাল থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম আরও জোরালো হয়। বিবেচনায়, এই চরটি মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর মাঝখানের বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ অঞ্চল।
শুধু বসতবাড়িই নয়, নদীভাঙনে হুমকিতে রয়েছে বয়ারচরের গুরুত্বপূর্ণ বাজার, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভুলুয়া নদীর ভাঙনে বয়ারচর সেতুর দুই পাশের মাটি সরে গিয়ে সড়কে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়, যার ফলে রামগতি-নোয়াখালী সড়ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন স্থানীয়দের পক্ষ থেকে নদী খনন, জিও ব্যাগ ডাম্পিং এবং বাঁধ নির্মাণ করার দাবি করা হয়েছিল।
এদিকে, মেঘনা ও ভুলুয়া নদীর জোয়ারের চাপেও বয়ারচরের তেগাছিয়া বাজার এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভাঙনে একটি পুলিশ ফাঁড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায় এবং স্থানীয় তেগাছিয়া বাজারের বেশ কয়েকটি দোকানও নদীতে বিলীন হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে গুরুত্বপূর্ণ বাজারটি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। চলতি বর্ষা মৌসুমে বয়ারচরের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: কেন্দুয়ায় পাচারের সময় ৩২ বস্তা সার জব্দ, চালক পালিয়েছে
স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছরই নদী ভাঙছে এবং মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। পাউবো সাময়িক কিছু ব্যবস্থা নিলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে না। তারা জানান, চলতি বর্ষায় রামগতি উপজেলার বয়ারচরের সেতু ঘাট থেকে চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধের একাধিক অংশ ভেঙে যায়। স্লুইসগেট এলাকার বাঁধ ভেঙে তিন শতাধিক ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে এবং পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে।
তাদের ভাষ্য, নদীভাঙনের কারণে একদিকে মানুষ বসতভিটা হারাচ্ছে এবং অন্যদিকে কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কমে যাচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে এবং শিক্ষা, চিকিৎসা ও পণ্য পরিবহনেও চরম দুর্ভোগ নেমে আসছে এ চরে।
স্থানীয় বাসিন্দা ওয়ারেছ মাঝি বলেন, "বয়ারচরে এখন প্রতিদিন জোয়ারের তীব্র স্রোতে পানি প্রবেশ করে এবং রাস্তাঘাট, স্কুল, মাদ্রাসা সব নদীর গর্ভে চলে যাচ্ছে। মনে হয় নদী আমাদের এ চরকে গিলে ফেলছে।" চরবাসীর দাবি, বয়ারচর রক্ষায় দ্রূত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হোক।
স্থানীয় চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) মো. দিদার উদ্দীন বলেন, "দ্রূত টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে আগামী বর্ষার আগেই রামগতি উপজেলার মানচিত্র থেকে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস করা এই চরটি বিলীন হয়ে যাবে।" তিনি জানান, সম্প্রতি চরের বাসিন্দারা ‘নদী ভাঙ্গন ঠেকাও, বয়ারচর বাঁচাও’ দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন ও পাউবোকে অনেকবার জানানো সত্ত্বেও কোন লাভ হয়নি।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
লক্ষ্মীপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খান বলেন, "বয়ারচরে মেঘনার ভাঙন নতুন নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ভাঙন রোধে বিভিন্ন সময় পাউবো অস্থায়ী কাজ করেছে। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ‘সবুজ পাতা প্রকল্প’-এ রামগতির বয়ারচরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।" নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, প্রকল্পের আওতায় নদীতীরে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের কাজ করা হবে। প্রকল্পটির অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে কাজ শুরু করা যাবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন