১১:৩৫ এম
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে পশ্চিম তীরের একটি ইসরায়েলি বসতিতে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। এই জায়গাটি আমাদের।’ উক্ত অনুষ্ঠানে জেরুজালেমের পূর্বদিকের ‘ই১’ এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের কাজ সামনে এগিয়ে নিতে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন নেতানিয়াহু। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০টি নতুন বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
ই১ এলাকাটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অবৈধ। আন্তর্জাতিক চাপের ফলে ইসরায়েল কয়েক দশক ধরে এই এলাকায় বড় ধরনের বসতি নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে বিরত ছিল। নতুন পরিকল্পনা নিয়ে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন দেশের তরফ থেকে সমালোচনা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘে মানবাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের আহ্বান বাংলাদেশ
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ‘অস্তিত্বের সংকট’ সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও কানাডা এক যৌথ বিবৃতিতে ই১ এলাকায় বসতি নির্মাণের পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এর ফলে পশ্চিম তীরে ভৌগোলিক বিভাজন তৈরি হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পরিকল্পনাটি বন্ধ করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়, ইসরায়েল পশ্চিম তীর, গাজা ও গোলান মালভূমি দখল করে। এর পরে থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ হলেও, গত কয়েক দশকে পশ্চিম তীরে এসব বসতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল সেখানে প্রায় ১৬০টি বসতি নির্মাণ করেছে। এসব বসতিতে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ইসরায়েলি বাস করছেন। ২০২২ সাল থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ওই বছর, ডানপন্থী ও বসতিপন্থী জোটের নেতৃত্বে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের সময় বসতি নির্মাণের প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। এর একটি উদাহরণ হল পশ্চিম তীরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জোফিম বসতি।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম
বিবিসি ভেরিফাইয়ের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে জোফিমে প্রায় ১৮৫টি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত বসতিটি হলো আগে উল্লেখ করা ই১ বসতি। এর কারণ বুঝতে হলে, বসতিটি কোথায় নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেই এলাকার মানচিত্র দেখতে হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং পূর্ব জেরুজালেম বাকি পশ্চিম তীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। প্রকল্পটির বিরোধীরা বলছেন, এর ফলে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। একই সঙ্গে, রামাল্লা, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে যুক্ত করা একটি ধারাবাহিক ফিলিস্তিনি নগর এলাকা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হবে।
ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিরোধী সংগঠন ‘পিস নাউ’ এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে। সংগঠনটি বলছে, সরকার আগামী অক্টোবরের নির্বাচনের আগেই ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা করছে। এতে পরবর্তী সরকার, ক্ষমতায় এসে নির্মাণকাজ বাতিল করতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
শুধু বসতিই সম্প্রসারিত হচ্ছে না। গত কয়েক বছরে, পশ্চিম তীরের প্রশাসনের একটি বৃহৎ অংশ সামরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নেতৃত্বাধীন একটি বেসামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পশ্চিম তীরজুড়ে বসতিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। এসব রাস্তা অনেক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামগুলোর মধ্যে যোগাযোগও বিভক্ত করছে।
আরও পড়ুন: জামায়াত নেতাদের ভারতীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি, রাশেদকে চ্যালেঞ্জ
স্মোট্রিচের মতে, এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, বসতিগুলো কেবল কাগজে-কলমে থাকবে না, বরং বাস্তবেও স্থায়ীভাবে গড়ে উঠবে। চলতি বছরের মে মাসে, ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরে নতুন রাস্তা নির্মাণের জন্য এক বিলিয়ন শেকেলের বেশি অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। সরকারি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই অর্থায়নের লক্ষ্য হলো পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা। এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৬ কোটি ডলার বা ২৪ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও বেড়েছে। সম্প্রতি, বসতি স্থাপনকারীরা দুটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘেরাও করে, তাদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ ঘটনাকে ইসরায়েলি বসতির অন্যতম সমর্থক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ‘অপরাধমূলক ও সন্ত্রাসী কাজ’ হিসেবে নিন্দা করেছেন।
সব মিলিয়ে, এসব ঘটনায় পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, পশ্চিম তীরে চলমান পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বাস্তবে অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। ইসরায়েলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর বক্তব্যেও এমন পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
২০২৪ সালে এক ভাষণে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ বলেছিলেন, ই১ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ‘জুডিয়া ও সামারিয়ায়’, অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েল যে নামে উল্লেখ করে, প্রথমে বাস্তবে এবং পরে আইনের মাধ্যমে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের লক্ষ্য হলো একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যর্থ করে দেওয়া।’
আরও পড়ুন: লাভরভ: ইউরোপের নেতারা রাজনৈতিক আত্মনিপীড়ক
ই১ প্রকল্পের জন্য সাম্প্রতিক দরপত্র আহ্বানের খবর এমন সময় এসেছে, যখন ইসরায়েলে গুরুত্বপূর্ণ ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন