০৩:৪৮ পি.এম
২৬ দিন ধরে চলা তীব্র অসহযোগ আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পাকিস্তান অধ্যূষিত কাশ্মির। কাশ্মিরে চলমান আন্দোলন ৩৮ দফা দাবিতে বিস্তৃত হয়ে উঠেছে এবং সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে আন্দোলন দমাতে।
এই আন্দোলনে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যদিও আন্দোলনকারীদের দাবি মৃতের সংখ্যা ৩০ জনেরও বেশি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। গ্রেপ্তার হয়েছে হাজারেরও বেশি মানুষকে।
আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান ও সরকারের কঠোর দমননীতির ফলে পাকিস্তান অধ্যূষিত কাশ্মির বর্তমানে অচল হয়ে পড়েছে। উচ্চ দ্রব্যমূল্য ও খাদ্য সঙ্কটের কারণে মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে কাশ্মিরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে।
আরও পড়ুন: নাইজেরিয়ায় প্রথম ইবোলা আক্রান্তের ভাইরাসের কেনিয়ার ভাইরাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিল
২০২৩ সালের মে মাসে আন্দোলন শুরু হয় নিত্য পণ্যের দাম কমানো ও বিদ্যুতের দাম ভর্তুকির দাবিতে। আন্দোলনটি পরিচালনা করছে বিভিন্ন নাগরিক প্লাটফর্ম মিলে গঠিত জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি, যা একটি অরাজনৈতিক সংগঠন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও কাশ্মিরে অনির্দিষ্টকালের শাটডাউন কর্মসূচির মাধ্যমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দাবি মানার আশ্বাস দেয়া হলেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। ৯ জুন থেকে ৩৮ দফা আন্দোলনের নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে। এর আগে ৫ জুন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটিকে। এ কারণে কমিটির পলাতক শীর্ষ নেতাদের ধরতে কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
এবারের আন্দোলনে সকল শ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করছে, বিশেষ করে নারীরা ও শিশুরা। ১০/১২ বছরের স্কুল শিক্ষার্থীরাও রাজপথে প্রতিবাদে গলা মেলাচ্ছে। আন্দোলনকারীরা রাজপথে স্লোগান দিচ্ছে- 'পাকিস্তানি বাহিনী দূর হটো', 'কাশ্মীর পাকিস্তানি হামলার শিকার', 'আমরা মৌলিক অধিকার চাই', 'আমরা বিনামূল্যে শিক্ষা চাই', ও 'জাতিসংঘ, আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি'।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলার তেল পরিশোধনে রিলায়েন্সের সঙ্গে কাজ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
কাশ্মিরের জনগণের প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ জনতা রাজপথে নেমেছে। অ্যাকশন কমিটির নেতারা জানান, পাকিস্তানের কেন্দ্রের বৈষম্য ও দমন পীড়নের ইতিহাস দীর্ঘ। তারা বাঙালি, বেলুচ ও পশতুদের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের আচরণ তুলে ধরেন। দাবি না মানলে সরকারকে বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক আন্দোলনের পরিণতির কথা মনে করিয়ে দেন। ৩৮ দফা দাবি না মানলে মুজাফফরাবাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকার পরিচালনা ও কাশ্মির থেকে পাকিস্তান হটানোর হুশিয়ারীও দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে ভারত সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করছেন যে, তারা কাশ্মিরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চড়া দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তাছাড়া, খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তারা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রটোকল বাতিলের দাবি তুলছেন, এবং সরকারি তহবিলের অপচয়ের অভিযোগও তুলছেন।
আগামী ২৭ জুলাই নির্বাচনের আগে এবারের আন্দোলন নতুন গতি পেয়েছে। বিধানসভায় কাশ্মিরের বাইরে অবস্থান করা শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি এ সংরক্ষিত আসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকার কাশ্মিরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। তাদের দাবি সংরক্ষিত আসন বাতিল করতে হবে।
সরকার কিছু দাবি মানার ঘোষণা দিয়েছে, তবে সংরক্ষিত আসন ও বিশেষ প্রটোকলের ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছে। অ্যাকশন কমিটি ছাড় দিতে রাজি নয়।
আরও পড়ুন: সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির নবম বৈঠক শুরু
আন্দোলন শুরু থেকেই দোকানপাট শাটডাউন, পরিবহন ধর্মঘট, লংমার্চ, অবস্থান ধর্মঘটের মত কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। মুজাফফরাবাদ, রাওয়ালকোট, মিরপুরসহ প্রধান প্রধান সব শহরের দোকানপাট, কাঁচাবাজার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্দোলন কাশ্মিরের অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় এক মাস ধরে উত্তাল কাশ্মির উপত্যকা।
সরকার আন্দোলনকারীদের পিছু হটাতে কঠোর দমননীতির পাশাপাশি খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রবেশ সীমিত করছে বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা বন্ধ হওয়ার কারণে ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবাসমূহ অচল হয়ে পড়েছে।
সরকার গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, কারফিউ জারি করে কাশ্মিরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলন এখন শুধু কাশ্মিরে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন দেশে বাস করা প্রবাসী কাশ্মিরিরাও পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে কর্মসূচি পালন করছে।
সম্প্রতি এক সমাবেশে অ্যাকশন কমিটির নেতা সরদার আমান খান বলেছেন, "পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর কখনোই পাকিস্তানের অংশ ছিল না।" তিনি দাবি করেন যে, এই অঞ্চলের জন্য পাকিস্তানের বেশি প্রয়োজন রয়েছে। আন্দোলনকারীদের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে সরকারর কঠোর অবস্থান কাশ্মিরে অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে। সব মিলিয়ে কাশ্মিরের ওপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনে আন্দোলন কিভাবে গতি পরিবর্তন করে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে যুবক হত্যার অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন