১১:১১ পি.এম
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। গতি ধীর হতে পারে, তবে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে।’ বিএনপি জুলাই সনদের পথেই এগোতে চায় এবং এ জন্য সবার সহযোগিতা ও আস্থা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক সংলাপের মাধ্যমে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন। সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যদি আমাদের তোপের মুখে না রাখেন, তাহলে আমরা পথ হারাতে পারি। তবে সেই চাপের ভাষা ও পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য কারোর সভা-সমাবেশে বাধা থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন: দাঁড়িপাল্লার বিজয়ে তৎপর জামায়াতসহ ১১ দল
প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি যেভাবে তৈরি করা হয়েছিল, তাতে প্রতিষ্ঠানটি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর মতো হয়ে উঠতে পারত। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে তারা সংসদে ফিরবেন। তবে তাদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। কোনো ক্ষেত্রে সফল না হলে সংশোধনের জন্য সরকার উন্মুক্ত। আইন কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি পরিবর্তনযোগ্য। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদেও সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন নিয়ে যৌক্তিক প্রস্তাব এলে তা অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, পেছনে ফিরতে চাই না। আমরা গুমের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।’
একটি গুমের অভিযোগ এসেছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সেটি তদন্ত করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে, তবে রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় মাঠে সাড়ে ৩ হাজার কোস্ট গার্ড
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই কিছু দুর্বলতা রয়েছে, তা অস্বীকার করছি না। তবে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের ভুল হতে পারে, তবে আমাদের চিন্তা স্বচ্ছ। বিএনপি জুলাই সনদের পথেই এগোতে চায়। আমাদের ওপর আস্থা রাখুন, আমরা সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চাই।’
সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, এখানে গণ–অভ্যুত্থান হয়েছে সংস্কারের জন্য, কোনো বিপ্লব হয়নি। সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করতে পারলে এ কঠিন যাত্রা সুস্থ প্রক্রিয়ার মধ্যে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি না হওয়ায় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফার চেতনাকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তবে তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অংশীজনদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সংস্কারের কাজে সবাইকে গঠনমূলকভাবে যুক্ত করতে হবে। দূরত্ব কমাতে নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সবার মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ঐকমত্য ছাড়া এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের নির্ভরশীলতা রয়েছে। তাই সব সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিতে হবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জাতীয় ঐক্য ও পরিচয় শক্তিশালী না হলে সংস্কার কার্যকর হবে না। বিচারক নিয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও পররাষ্ট্রনীতিতে দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে।
আরও পড়ুন: এনসিপি কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, দুর্বৃত্তদের হামলা
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক বলেন, র্যাবের নাম পরিবর্তন করে শুধু প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদ যে পথে হেঁটেছে, তার বিপরীত পথে হাঁটতে না পারলে সেই সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া যাবে না।
একই দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে এসেছিল। সেই আস্থা নষ্ট করা উচিত নয়। গণভোটের রায় জনগণ দিয়েছে এবং এই রায় বিএনপিকেই বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশ জাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য খাতে শুধু চিকিৎসকদের দোষারোপ করে মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমিশন নিয়েও তেমন আলোচনা হচ্ছে না।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, শুধু পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান থেকে দেশকে রক্ষা করতে গণভোটের রায়কে গুরুত্ব দেওয়া এবং তা মেনে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন: মোটরসাইকেলের সামনে ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট বাধ্যতামূলক করেছে বিআরটিএ
গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সরকারের ঘাটতি থাকলে জনগণ তা সহজেই বুঝতে পারবে। সামগ্রিকভাবে কাজ করতে হবে এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলেও মব ভায়োলেন্স (উচ্ছৃঙ্খল জনতা কর্তৃক সহিংসতা) অব্যাহত রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে বিনিয়োগ আসবে না। ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সিনিয়র সাংবাদিক ও চর্চা সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক বিষয়গুলো এখনো নিশ্চিত হয়নি। গণমাধ্যমের ওপর থাকা অদৃশ্য বাধা দূর করে সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীন করতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের আইনবিষয়ক সম্পাদক এম ইকবাল হাসান বলেন, মাজারে ভাঙচুর ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে হামলার ঘটনায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারগুলো বরাবরই অনীহা দেখায়।
আরও পড়ুন: সাতসকালে রাজধানীর সড়কে প্রাণ গেল দুই নারীর
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। ভবিষ্যতের কমিশনগুলো দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, আইনের শাসন সবার জন্য সমান হওয়া দরকার। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জায়গা সরকারকে তৈরি করতে হবে। নাগরিকদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কথার চেয়ে কাজের মাধ্যমে তা দেখাতে হবে।
সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে দায়িত্বশীল বক্তব্য ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। জনগণ স্পষ্ট ও দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, বিদ্যমান কাঠামোতে ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আরও পড়ুন: শিক্ষার মান পরিমাপে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর সুপারিশ
বর্তমান সরকার মানবাধিকার সুরক্ষা ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে প্রত্যাশা জানান গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া সমাবেশে অনুমতি না পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর প্রত্যাশা থাকলেও বিএনপি হয়তো বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। শুরুতে তিনি বলেন, জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বিবেচনা করেই ভোট দিয়েছে। সরকারের সামনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকলেও জনগণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। তাই ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জনগণকে হতাশ না করে সকলকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন