০২:৪১ এম
চলতি মাসের জুনে, রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চার দিনে অন্তত ছয় দফা ভূমিকম্পের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই ভূমিকম্পগুলো যে বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের চিন্তাভাবনা রয়েছে।
২২ জুন (আজকের সর্বশেষ কম্পন)
আজ সোমবার (২২ জুন) রাত সাড়ে ৯টায় হঠাৎ করে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। ঢাকা ও এর চারপাশের বাসিন্দারা স্পষ্ট অনুভব করেন এই ভূমিকম্প। এরপরেও, তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া না গেলেও, রাতের এই আকস্মিক কম্পনে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: দেশের স্বার্থে কোনো ছাড় নয়: মৎস্য প্রতিমন্ত্রী টুকু
১৮ জুন (মণিপুর সীমান্ত)
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাত ৯টা ২৯ মিনিটে আবহাওয়া অধিদপ্তর একটি মৃদু ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৩৬১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে ভারতের মণিপুর অঞ্চলে।
১১ জুন (শিলচর সীমান্ত)
এর এক সপ্তাহ আগে, ১১ জুন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশে আরও একটি কম্পন অনুভূত হয়। ইউরোপীয় মেডিটেরিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৫। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেটের করিমগঞ্জ সীমান্তে ভারতের শিলচরে, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে ছিল। সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকার কিছু অঞ্চলে এটি তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ভারতীয় পর্যটকেরা বলছেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে পূজার পরিবেশ ভালো: রিজভী
৭ জুন (ভুটান কেন্দ্র)
চলতি মাসে এই ভূমিকম্পের ধারাবাহিকতা শুরু হয় ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল প্রতিবেশী দেশ ভুটানে। ভুটানের থিম্পুর উত্তর-পূর্বে আঘাত হানা ওই ভূমিকম্পের প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে ঢাকাসহ দেশের মধ্যাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা প্রবল ঝাঁকুনিতে কেঁপে ওঠে। অনেকেই সে রাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন।
স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, এই ৪টি ভূমিকম্পের মধ্যে কোনোটিতেই বাংলাদেশে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ৪ বার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে?
আরও পড়ুন: ভোটের পাঁচ দিন আগে বাইশিমাস নির্বাচন স্থগিত, প্রার্থীদের প্রতিবাদ
চলতি বছরে দেশে আরও কয়েক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। চলতি ফেব্রুয়ারিতে ধারাবাহিক কম্পন নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার এক সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে আছে।
তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটি— উত্তরের ডাউকি ফল্ট এবং পূর্ব দিকে সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাহাড়ের বিস্তৃত সাবডাকশন জোন। এখানে বার্মা প্লেটের নিচে ইন্ডিয়া প্লেটটি তলিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বৈজ্ঞানিক পরিমাপে দেখা গেছে, এই সংযোগস্থলে বর্তমানে ৮.২ থেকে শুরু করে প্রায় ৯ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করার মতো বিশাল শক্তি জমা হয়ে আছে!
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানিয়েছেন, সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো এই ফল্ট লাইনটি বর্তমানে পুরোপুরি ‘লকড’ বা আটকে আছে। কোনো স্লিপ বা ছোটখাটো মুভমেন্টের মাধ্যমে দীর্ঘ দিন ধরে এই শক্তি অবমুক্ত হচ্ছে না। এভাবে শক্তি বের না হয়ে জমে থাকা বাংলাদেশের জন্য ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিজে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা না হলেও, স্বল্পকালীন এই লকড কন্ডিশনের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক দিয়ে বিশ্বের অন্যতম জায়গা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই যখনই এখানে বড় ভাঙন হবে, তা অত্যন্ত প্রলয়ঙ্করী রূপ নেবে।
আরও পড়ুন: হায় সেলুকাস, আমাদের এই বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি
ঘন ঘন ভূমিকম্প কি কিয়ামতের আলামত?
যদি বড় কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে বহুতল এবং দুর্বল ভবনগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক কার্যক্রম বাসনীয় হবে না। তবে সঠিক কৌশল জানা থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং জীবনহানি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব।
অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার সতর্ক করেছেন যে, ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করে বহুতল ভবন থেকে নিচে নামা বা রাস্তার মধ্যে জড়ো হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। বরং ঘরের মধ্যে থেকেই ‘ড্রপ, কাভার অ্যান্ড হোল্ড’ পদ্ধতি অনুসরণ করে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেওয়া উচিৎ।
বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নিয়মটি আমাদের জন্য কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। এই পদ্ধতিটি হলো—
আরও পড়ুন: বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত
ড্রপ: কম্পন শুরু হলে আতঙ্কিত না হয়ে যেখানে আছেন সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ুন।
কাভার: ঘরের ভেতর থাকা শক্ত টেবিল, খাট, সোফা সেট বা বিমের নিচে অবস্থান নিন এবং মাথার ওপর হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় সুরক্ষিত রাখুন।
হোল্ড: কম্পন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই শক্ত আশ্রয়টি ধরে রাখুন, যেন ঝাঁকুনিতে আপনি ছিটকে না যান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সংস্থাগুলো বড় বাজেটের মধ্যম বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, যেখানে বাণিজ্যের সুযোগ বেশি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ১ শতাংশেরও কম খরচে তাৎক্ষণিক এবং স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া।
আরও পড়ুন: স্বৈরাচারের গুলি দেখেনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে খ্রিষ্টান: প্রধানমন্ত্রী
অধ্যাপক হুমায়ুনের মতে, তরুণদের প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ‘ন্যাচারাল হ্যাজার্ড গেম’ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ডিজিটাল গেম তৈরি করে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করা সম্ভব।
এভাবে মানুষ খেলার মাধ্যমে শিখবে, ঘরে, রাস্তায়, অফিসে বা রাতে ভূমিকম্প হলে কী করতে হবে। একই সময়ে প্রতিটি ওয়ার্ড বা মহল্লায় নিয়মিত সাইরেন বাজিয়ে ভূমিকম্পের মহড়া দেওয়া উচিত। এতে মানুষের মানসিক মনোবল তৈরি হবে এবং বড় দুর্যোগে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন