১২:১৯ এম
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির পরিকল্পনায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি। এই উদ্দেশ্যে দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মাধ্যমে ৭৬৫ কেভির উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সঞ্চালন লাইন নির্মাণের অনুমতি চেয়েছে ভারত।
তবে, একতরফাভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দিতে রাজি নয় ঢাকা। বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সমান সুবিধা ও আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিডের নিশ্চয়তা ছাড়া এ প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া হবে না। বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সম্প্রসারণে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা গেলে ভারতের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিবহনের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। এই কারণে ভারত প্রস্তাবিত করিডর নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতায় আগ্রহী।
আরও পড়ুন: ওমান উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, নিহত এক ভারতীয় নাগরিক
গত ৯ ও ১০ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে বিদ্যুৎ সচিবদের সম্মেলনে বিষয়টি উত্থাপন করে নয়াদিল্লি। সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে ভারত পার্বতীপুর দিয়ে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার সঞ্চালন করিডর ব্যবহারের অনুমতি চায়। প্রস্তাবিত ৭৬৫ কেভি লাইনের মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি করতে চায় ভারত। তারা জানায়, বাংলাদেশও চাইলে এ লাইন ব্যবহার করে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে।
তবে, বাংলাদেশের অবস্থান এবার আগের মতো একতরফা সুবিধা দেওয়ার নয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমান সুযোগ নিশ্চিত না করে এ করিডরের অনুমতি দেওয়া হবে না। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে ভারত-ভুটান-বাংলাদেশ কিংবা নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ, যেকোনো কাঠামোয় আঞ্চলিক গ্রিড গড়ে তোলা যেতে পারে। বাংলাদেশ কোনো একক দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে বহুপক্ষীয় বিদ্যুৎ সহযোগিতা চায়।
বিদ্যুৎখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের এ অবস্থানের ফলে করিডর প্রস্তাবটি কেবল ভারতের বিদ্যুৎ পরিবহনের বিষয় নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতও উপকৃত হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ পরিবহনে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঢাকার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারত পার্বতীপুর দিয়ে ৭৬৫ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছিল। ভারতের কাটিহার থেকে আসামের বরনগর পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিবহনের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের বিষয়টি ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগে ১৯ ও ২০ জুলাই দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হলেও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ওই পরিকল্পনায় ২০২৫ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৮ সালে শেষ করার লক্ষ্য ছিল।
আরও পড়ুন: পোশাক কারখানা বন্ধে ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা
গত ৬ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরে মন্ত্রী বলেন, ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গ্রিড লাইন নিতে চায়, বাংলাদেশ সেভাবে বিষয়টি বিবেচনা করছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারতের প্রস্তাবের বিপরীতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক গ্রিডের শর্ত দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যুৎ সহযোগিতার নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ভারতের কাছে যত বাড়বে, ততই এ বিষয়ে ঢাকার দর-কষাকষির সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন