০১:৪১ পি.এম
২১ বছর বয়সী গ্যাভিন হিঙ্কলে এবং তার ২০ বছর বয়সী বাগদত্তা ম্যাডেলিন ফক্স, তারা তখন স্বপ্নে ছিলেন, প্রেমের উড়ানে। তাদের বিয়ে হতে বাকি রয়েছে মাত্র এক সপ্তাহ।
সভ্যতার সেই অনুষ্ঠান পরিকল্পনার মাঝে গোটা জীবন সাজানোর মুহূর্তগুলো তাদের জন্য দুঃস্বপ্নের রূপ ধারণ করল। হঠাৎ একটি ফোর্ড গাড়ি এসে যমদূতের মতো আক্রমণ করে তাদের টেসলার মাঝ বরাবর ধাক্কা দেয়। এতে তাঁদের গাড়ি দুমড়ে যায়। একই সাথে দুমড়ে-মুচড়ে যায় দুই তরুণটির স্বপ্নও। গ্যাভিন সেই স্বপ্ন থেকে চলে যান চিরতরে। ম্যাডেলিন অভ্যন্তরীণভাবে বেঁচে থাকলেও, বেঁচে থাকার মতো অবস্থানে নেই। তার স্বপ্ন মুছে গেছে, তার প্রিয়তমকে হারিয়েছেন চিরতরে, এবং তার নিজ জীবন এখন বিছানায় আটকে আছে। কিছুদিন কোমায় থাকার পর, ম্যাডেলিন স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন।
আরও পড়ুন: মঙ্গলবার থেকে ৫ দিনের ছুটি, জরুরি পরিষেবা থাকবে সচল
যে গাড়িটি সেই যমদূত হয়ে এসেছিল, সেটা চালাচ্ছিলেন গ্লিন উইলবার্ন, যিনি একজন ডেপুটি শেরিফ। তাকে রাস্তায় একটি গুলির খবর পেয়ে সাইরেন বাজিয়ে, লাল বাতি জ্বালিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটতে দেখা যায়। কিন্তু দুর্ঘটনার ঠিক আগে তিনি জানতে পারেন, আগে থেকেই অন্য একটি পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত রয়েছে এবং সন্দেহভাজন গাড়িটি সেখানে আর নেই।
একজন দায়িত্বরত ডেপুটি শেরিফের সিগনাল অমান্য করে একটি গাড়ির ধাক্কায় একজন নিহত হয়েছেন এবং একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এই কারণে ঘটনার ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই দুর্ঘটনাটি ক্যালিফোর্নিয়ার বিউমন্ট এলাকায় ঘটেছে। গত সেপ্টেম্বরে এই দুর্ঘটনার পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কিন্তু ঘটনার ৯ মাস পর নতুন করে আলোচনার শুরু হয়েছে। কারণ রিভারসাইড কাউন্টি অফিসের ডেপুটি শেরিফ ৪২ বছর বয়সী উইলবার্নের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনার এবং তার বিচার শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, অসতর্ক গাড়ি চালিয়ে তিনি হত্যা করেছেন এবং গুরুতর আহত করেছেন। অভিযোগের প্রমাণ হলে তার ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
আরও পড়ুন: নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অস্ট্রেলীয় সিনেটর জর্ডন স্টিল-জন
গত সপ্তাহে, রিভারসাইড কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিস থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, উইলবার্নকে প্রশাসনিক ছুটিতে রাখা হয়েছে, এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিস জানায়, 'একটি গুলির খবর পেয়ে উইলবার্ন বিউমন্ট থেকে ক্যালিমিসায় যাচ্ছিলেন। চেরি ভ্যালি বুলেভার্ড দিয়ে আনুমানিক ঘণ্টায় ১০০ মাইল গতিতে যাওয়ার সময় উইলবার্ন একটি ইন্টারসেকশনে প্রবেশ করেন এবং সিগনাল অমান্য করে ঘণ্টায় প্রায় ৭১ মাইল গতিতে চলা একটি বেসামরিক গাড়িকে পাশ থেকে ধাক্কা দেন। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিসের দায়ের করা ফৌজদারি অভিযোগে বলা হচ্ছে, উইলবার্ন চরম অবহেলার সাথে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তিনি সিট বেল্ট পড়া ছিলেন না। তদন্তে দেখা যায়, ধাক্কা লাগার ঠিক আগ মুহূর্তে উইলবার্ন সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং স্টিয়ারিং হুইলটি ডানদিকে ঘুরিয়েছিলেন। তবে অতিরিক্ত গতির কারণে তিনি সিগনালে থামতে পারেননি।
ক্যালিফোর্নিয়া হাইওয়ে পেট্রোলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'উইলবার্নের অবহেলাই ছিল চালক গ্যাভিনের মৃত্যু এবং যাত্রী ম্যাডেলিনের গুরুতর আঘাতের কারণ।' গ্যাভিনের পরিবার, ডিস্ট্র্রিক্ট অ্যাটর্নির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, আইন প্রয়োগকারীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড ঠেকানো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একজন দায়িত্বরত ডেপুটি শেরিফের বিরুদ্ধে হতার মতো গুরুতর অভিযোগ আমলে নেয়া প্রমাণ করে, আইন সবার জন্য সমান। তবে একই সাথে এই ঘটনায় কিছু বিষয় সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? দুর্ঘটনায় উইলবার্ন নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু তার আঘাত গুরুতর ছিল না। তবে উদ্ধারকারীরা গুরুতর আহত গ্যাভিন ও ম্যাডেলিনকে ফেলে, সামান্য আহত এক ডেপুটি শেরিফকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তারা উইলবার্নকেই আগে হাসপাতালে নিয়ে যান। দ্রুত হাসপাতালে নিলে গ্যাভিন বেঁচে যেতে পারতেন এবং ম্যাডেলিনের ক্ষতিও অনেক কম হতে পারত। এখানে আইন ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে।
একজন দায়িত্বরত ডেপুটি শেরিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের স্পর্শকাতরতার বিষয়টিও রয়েছে প্রসিকিউটরদের মনে। রিভারসাইড কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নি মাইকেল হেস্ট্রিন বলেছেন, 'যখন কোনো মামলায় কর্মরত আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা ঘটনায় জড়িত থাকেন, তখন সেই ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা আমাদের দায়িত্ব।' তবে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ম্যাডেলিনের পরিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'আইন সবার জন্য সমান। কোন ব্যাজ, পদবি বা অবস্থান কাউকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।' তারা জানায়, 'গ্যাভিন এবং ম্যাডেলিনের সঙ্গে যা ঘটেছে তা ঠেকানো সম্ভব ছিল।' ডেপুটি শেরিফকে উল্লেখযোগ্য কর্তৃত্ব এবং দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তিনি জরুরি যানবাহন চলাচলের বাধ্যবাধকতাগুলো বুঝতেন। আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা কিছু আইনী অধিকার পান, যা শুধুমাত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন অন্যদের নিরাপত্তার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে তা প্রয়োগ করা হয়।
আরও পড়ুন: ঢাকায় ১ নভেম্বর থেকে ৬ রুটে চালু হচ্ছে ‘এক রুট এক কম্পানি’ বাস পরিষেবা
এ মামলার শুনানির তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। তবে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার পাওয়া বিশেষ অধিকার, জরুরি যানবাহন পরিচালনার নীতি, উদ্ধারকারীদের অগ্রাধিকার নীতি- এসব বিষয় নিয়ে গুরুতর আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্যাভিন ও ম্যাডেলিনের পরিবারও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছে। ম্যাডেলিনের বাবা-মা এক বিবৃতিতে বলছেন, 'আশা করি এ বিচার একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, যাদের ওপর জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ড যখন অকল্পনীয় ক্ষতির কারণ হয়, তখন তাদেরকেও অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।'
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন