১১:৩২ পি.এম
বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার স্বাধীনতার ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং মুক্তির চেতনার মধ্যে গভীর মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি মন্তব্য করেন, আলজেরিয়া মুক্তি লাভের জন্য ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, আর বাংলাদেশ পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
উভয় দেশের জন্য লাখো শহীদ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। রবিবার (৫ জুলাই) ঢাকায় আলজেরিয়ার ৬৪তম স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলওয়াহাব সাইদানি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, বাংলাদেশ-আলজেরিয়া বিজনেস ফোরামের সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল মোস্তফাসহ ব্যবসায়ী, বিশিষ্টজন, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী: দেশ গড়ার সংগ্রামে ধর্ম নয়, নাগরিক পরিচয়ই মুখ্য
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার যুবসমাজ স্বাধীনতার জন্য অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছে। তাদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্মের শেখার সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দেশের জন্য আত্মনিবেদন ও দেশপ্রেম।
দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদারের আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিপুল সুযোগ রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ-আলজেরিয়া বিজনেস ফোরামের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন এবং এর সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল মোস্তফার ভূমিকাকে সাধুবাদ জানান।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, আলজেরিয়া একটি প্রাকৃতিক ও খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। দেশটি ইউরোপের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে, যা এর কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করেছে। একই সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত আলজিয়ার্স বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন শহর।
মন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, বাণিজিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও আলজেরিয়া উভয় দেশই বিশ্বাস করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের।
আরও পড়ুন: একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির, ১১১ বছরের সহাবস্থানে সম্প্রীতির নজির
দুই দেশের পতাকার সবুজ ও লাল রঙের মধ্যেও স্বাধীনতার চেতনার প্রতীকী মিল রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।
আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেলওয়াহাব সাইদানি মন্তব্য করেন, আলজেরিয়ার স্বাধীনতা কেবল একটি দেশের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির ইতিহাস নয়; বরং এটি বিশ্বব্যাপী মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীকেরূপে বিবেচিত। আলজেরিয়ার জনগণের আত্মত্যাগ বর্তমানে বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
তিনি বলেন, ১৯৬২ সালের ৫ জুলাই ১৩২ বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে আলজেরিয়া। একই দিনে দেশটিতে জাতীয় যুব দিবসও পালিত হয়, কারণ স্বাধীনতা সংগ্রামে তরুণদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘দ্য লেগ্যাসি অব জেনারেশনস’ বা ‘প্রজন্মের উত্তরাধিকার’, যা স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী পূর্বসূরিদের স্মরণ এবং নতুন প্রজন্মকে দেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করার বার্তা বহন করে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল উপনিবেশবিরোধী ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এ যুদ্ধে যথাক্রমে ৫৬ লাখ আলজেরীয় শহীদ হন। স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া শুধু নিজের উন্নয়নই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন মুক্তি আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা ও সহায়তা দিয়েছে। এ কারণে একসময় দেশটিকে ‘বিপ্লবীদের মক্কা’ বলা হতো।
আরও পড়ুন: আমিনী: আইন অনুযায়ী আমি অপরাধী, তবে অনুতপ্ত নই
তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, জোটনিরপেক্ষতা ও উপনিবেশবিরোধী নীতিই আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। আলজেরিয়া ফিলিস্তিন ও পশ্চিম সাহারা ইস্যুসহ বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের ন্যায্য অধিকার পক্ষে সবসময় সোচ্চার।
রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ভূমধ্যসাগর ও সাহেল অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে আলজেরিয়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশটি ইউরোপের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তিনি জানান, স্বাধীনতার পর শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে আলজেরিয়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তরুণ উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ২০২৬-২০২৯ সালের জাতীয় যুব পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৬ সালে আলজেরিয়ার জিডিপি ৩১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন বিনিয়োগ আইনসহ বিভিন্ন সংস্কারের ফলে, দেশটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানান, ওষুধশিল্প, কৃষি, জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য। এসব খাতে শতভাগ বিদেশি মালিকানা, কর অব্যাহতি এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রণোদনার সুবিধা আছে বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন: ঢাকা রেসিডেনসিয়ালে ২৩ দেশের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সফল ডিআরএমসি বিজনেস সামিট
বাংলাদেশ-আলজেরিয়া বিজনেস ফোরামের ভূমিকা তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। বলেন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সফর, নেটওয়ার্কিং এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফোরামটি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরো জোরদার করছে।
বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরো দৃঢ় করেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম আরব দেশ ছিল আলজেরিয়া। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই বর্তমানে দুই দেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণে কাজ করছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন