০২:৪৮ এম
তিন বছর আগে ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধটি গাজায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সাথে সাথে এটি লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরাক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এক পর্যায়ে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানও।
এই দীর্ঘ সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো অনেক হিসাব পরিবর্তিত হয়েছে। ইরানের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়েছে। একই সময়ে সামরিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে উঠে এসেছে ইসরাইল। তবে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে- এই শক্তি কি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হবে, নাকি নতুন সংঘাতের দরজা খুলে দিচ্ছে?
আলজাজিরার একটি বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ৭ অক্টোবরের পর তিন বছরে মধ্যপ্রাচ্যে জোট, অর্থনীতি এবং শক্তির ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: নাজরানে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, সৌদি আরবে দুই ক্রু নিহত
দুর্বল ‘প্রতিরোধ অক্ষ’
ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইয়েমেনের হুথিদের মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলো ছিল। কিন্তু গত তিন বছরের যুদ্ধে এই নেটওয়ার্কের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
ইসরাইলের হামলায় হিজবুল্লাহ ও হামাসের বহু শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনও ইরানের জন্য একটি বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। কারণ সিরিয়া ছিল ইরান থেকে লেবাননে হিজবুল্লাহর কাছে সরবরাহ পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ করিডর। তবে এই দুর্বলতার মধ্যেও ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হিসেবে টিকে আছে। বরং সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে তাদের অগ্রযাত্রা বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে।
আরও পড়ুন: ইউরোপের ৪ দেশে বিক্ষোভকারীরা, উত্তাল রাস্তায়
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতায় ফাটল
৭ অক্টোবরের আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় কৌশল ছিল ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। কিন্তু যুদ্ধ সেই পরিকল্পনার গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক এইচএ হেলিয়ার বলেন, ৭ অক্টোবরের পর ইসরাইলের প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার ওপর আস্থাও কমেছে। চলতি বছরের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলা সেই ধারণাকে আরও দুর্বল করেছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল মাঠে ট্রাক ঢুকে নিহত ২, আহত ১০
কাতারের রাস লাফান গ্যাসকেন্দ্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, দুবাই বিমানবন্দর ও ফুজাইরাহর তেল অঞ্চলের কাছে আগুন এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুথিদের হামলা- সব মিলিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে।
এরই মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান আগস্টে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। চুক্তির মূল কথা হলো- তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ইসরাইল কি এখন সবচেয়ে শক্তিশালী?
সামরিক দিক থেকে ইসরাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি- এমন মূল্যায়ন রয়েছে। কিন্তু সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এক বিষয় নয়।
আরও পড়ুন: ক্যালিফোর্নিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে, বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, ৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যে বাইরের শক্তিগুলোর প্রভাব আরও বেড়েছে। তুরস্ক সিরিয়ায় সক্রিয় হয়েছে, আর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় চীনের ভূমিকাও বেড়েছে।
তার মতে, এর মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন হলো- ইসরাইল এখন যেন ‘পরিবর্তনকামী শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, আর ইরান বরং হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারে মনোযোগী।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের একচ্ছত্র আঞ্চলিক পরাশক্তি হয়ে গেছে। ভাকিলের মতে, সামরিক শক্তিতে ইসরাইল এগিয়ে থাকলেও প্রকৃত আঞ্চলিক শক্তির অন্যতম মাপকাঠি হলো স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা। আর সেই জায়গায় ইসরাইল এখনো সফল হয়নি।
গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় নতুন বাস্তবতা
আরও পড়ুন: কানাডার সামরিক ঘাঁটিতে অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে দমকল
গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতাই বদলে দিয়েছে। ইসরাইল গাজার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে উপত্যকার অবকাঠামো বিপর্যস্ত হয়েছে।
লেবাননেও পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এবং ২০২৬ সালের মার্চে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে অভিযান চালায়। এর পাশাপাশি সিরিয়ার পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর ইসরাইল সেখানে নিজেদের নিরাপত্তা অবস্থান আরও শক্ত করেছে। ফলে ইসরাইলের চারপাশের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো আর আগের অবস্থায় নেই।
অর্থনীতিতেও পড়েছে যুদ্ধের ছাপ
যুদ্ধের প্রভাব শুধুমাত্র সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোও সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাবও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
আরও পড়ুন: পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা
ইরান ও তার মিত্র হুথিদের সামরিক তৎপরতার কারণে দুটি নৌপথই এখন বাড়তি ঝুঁকির মুখে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হলেও এর প্রভাব সব দেশের ওপর সমান নয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করা হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো তুলনামূলক বড় ধাক্কা খেয়েছে। সৌদি আরবের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে। কাতারের ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বদলে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তাহলে নতুন মধ্যপ্রাচ্য কেমন?
তিন বছর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- ৭ অক্টোবরের পর যে নতুন মধ্যপ্রাচ্য তৈরি হয়েছে, সেটি কোন দিকে যাচ্ছে? ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা দুর্বল হয়েছে। ইসরাইল সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থায় ভাটা পড়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নতুন অংশীদারিত্ব খুঁজছে। একই সময়ে চীনও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্য এখন আর আগের মতো একটি নির্দিষ্ট শক্তির ছায়ায় নেই। বরং একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে দেশগুলো।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ৭ অক্টোবরের পর শুরু হওয়া যুদ্ধ। তবে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় উত্তর এখনো মেলেনি- সামরিক শক্তির মাধ্যমে বদলে যাওয়া এই মধ্যপ্রাচ্য কি শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীল হবে? নাকি পুরোনো সংঘাতের জায়গায় জন্ম নেবে আরও নতুন সংঘাতের রেখা?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন