০৯:৪৭ এম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রাসী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দিকে আরো কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ছোট্ট নর্ডিক দেশ আইসল্যান্ডের। আজ শনিবার দেশটিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা সিদ্ধান্ত নেবে ইইউতে যোগদানের আলোচনা পুনরায় শুরু হবে কি না। প্রায় চার লাখ মানুষের এই ভোটে ফলাফল নিয়ে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা।
আইসল্যান্ড ২০০৯ সালে ইইউতে যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করেছিল। সেই সময় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটির অনেক পরিবার ও ব্যবসা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তবে কয়েক বছর আলোচনা চলার পর ক্ষমতায় আসা মধ্য-ডানপন্থি সরকার উদ্যোগটি স্থগিত করে। তাদের উদ্বেগ ছিল যে, ইইউতে যোগ দিলে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিজেদের জলসীমায় মাছ ধরার ওপর নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাবে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের গোয়াদরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ৩ সন্ত্রাসী
এক দশকেরও বেশি সময় পর সেই পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। বর্তমান মধ্য-বাম জোট সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে ইইউর সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি তারা ইইউ, অন্যান্য নর্ডিক দেশ ও ন্যাটোর সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার নীতির কথাও উল্লেখ করেছে।
তবে এবার বিতর্কের পটভূমি আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের পর বদলেছে নিরাপত্তার হিসাব।
গণভোটের প্রচারে অর্থনীতি মূল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। ইউরোজোনে যোগ দিলে কী হবে, মাছ ধরার নীতিতে কী পরিবর্তন আসবে—এসব প্রশ্নই সামনে এসেছে। কিন্তু ভোট হচ্ছে এমন সময়ে, যখন আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ইউরোপের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের লড়াই বদলে দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট
গত বছর থেকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী পদক্ষেপ আর্কটিক নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে। আইসল্যান্ডের নিজস্ব সেনাবাহিনী বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নেই। তবে তাদের শক্তিশালী কোস্টগার্ড রয়েছে। ফলে বড় শক্তিগুলোর চাপ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই সময়ে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আইসল্যান্ড অবশ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একা নয়। দেশটি ন্যাটোর সদস্য। ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইএ)-এরও সদস্য। এই সদস্যপদ তাদের ৩০টি দেশের মধ্যে মানুষ, পণ্য ও পুঁজির অবাধ চলাচলের সুযোগ দেয়। শেনজেন অঞ্চলেরও সদস্য আইসল্যান্ড।
রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরু করার পর আইসল্যান্ডে মার্কিন নৌবাহিনীর কার্যক্রম ও ন্যাটোর বিনিয়োগ আবার বেড়েছে। সম্প্রতি ন্যাটোর আরও চার সদস্য দেশের সঙ্গে আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারের চুক্তিও করেছে দেশটি।
ব্রাসেলসের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আইসল্যান্ডের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি।
আরও পড়ুন: নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের দাবি জানালো নিসচার
ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের ইউরোপীয় ও বৈশ্বিক বিষয়বিষয়ক পরিচালক আলমুট মোলার বলেন, "১০ বছর আগের তুলনায় এখন ইইউর নিরাপত্তা কাঠামোয় আইসল্যান্ড অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।"
বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে ইইউ নতুন সদস্য নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের সক্রিয়তা ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব প্রদর্শন করতে চাইছে বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিটের পর নতুন সদস্য নেওয়ার বিষয়টি জোটটির জন্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে।
‘আগে দেখি, তারপর সিদ্ধান্ত’
আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্তুন ফ্রস্তাদোতির ইইউতে যোগদানের পক্ষে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছেন না। তিনি বলেন, "আগে আলোচনার দরজা খুলে দেখা হোক, ইইউ কী ধরনের চুক্তি দিতে পারে।"
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী
তাঁর ভাষায়, ইইউ নিয়ে কেউ ‘হয়তো’ অবস্থানে থেকেও আলোচনার পক্ষে ভোট দিতে পারেন। কারণ, আগে জানতে হবে সম্ভাব্য চুক্তিটি আসলে কেমন।
প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম বড় যুক্তি অর্থনীতি। বর্তমানে আইসল্যান্ডে অস্থির ক্রোনা মুদ্রা চালু আছে। ইউরোজোনে যোগ দিলে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আরও স্থিতিশীলতা পাবে বলে মনে করেন তিনি।
নিজস্ব মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতেও বিপুল অর্থ ব্যয় হয় বলে জানিয়েছেন ফ্রস্তাদোতির। ইইউতে যোগ দিলে আর্কটিক কৃষির জন্য অনুদান, অবকাঠামো ঋণ এবং একাডেমিক গবেষণায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগও মিলতে পারে।
তবে ব্রাসেলসের হাতে আরও ক্ষমতা তুলে দেওয়ার বিষয়ে মানুষের উদ্বেগ রয়েছে—এ কথাও স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন: বিমানের দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত
ইইউবিরোধীদের ভয় মাছ ধরার জলসীমা নিয়ে
ইইউবিরোধীদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সার্বভৌমত্ব ও নিজেদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
বিদেশি জাহাজ আইসল্যান্ডের মাছ ধরার জলসীমায় প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে—এটাই তাদের বড় আশঙ্কা। নর্ডিক কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিরোধী দল ইনডিপেনডেন্স পার্টির নেতা গুদরুন হাফস্টেইন্সদোতিরও ইইউতে যোগদানের বিরোধিতা করছেন। তাঁর প্রশ্ন, "সিদ্ধান্তের শেষ কথা যদি আইসল্যান্ডের হাতে না থাকে, তাহলে ইইউর সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে একটি আসনের মূল্যই বা কতটুকু?"
আরও পড়ুন: ইরানের ওপর ভয়াবহ হামলা করেছি, আবারো হামলা চালাব: ট্রাম্প
ইইউবিরোধীদের আরেকটি যুক্তি অর্থনৈতিক। তাদের ধারণা, নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণই আইসল্যান্ডের সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। সেই নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধিও ঝুঁকিতে পড়বে।
জরিপে সামান্য এগিয়ে ‘হ্যাঁ’
গ্যালাপের সর্বশেষ জরিপে গণভোটের ফলাফলের কোনো স্পষ্ট পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে না। যারা নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ ইইউর সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর পক্ষে। বিপক্ষে ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অল্পসংখ্যক ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
অর্থাৎ ভোটের ফল নির্ধারণে সামান্য ব্যবধানই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আজ ‘হ্যাঁ’ ভোট পেলেই আইসল্যান্ড ইইউর সদস্য হয়ে যাবে না। প্রথমে শুরু হবে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা। এরপর সম্ভবত এক বছরেরও বেশি সময় পরে আরেকটি জাতীয় গণভোট হবে। সেখানে সিদ্ধান্ত হবে, আইসল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউতে যোগ দেবে কি না।
আইসল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, সদস্যপদের চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রায় ১৮ মাস সময় লাগতে পারে।
সমৃদ্ধির মাঝেও কেন ইইউ নিয়ে আগ্রহ?
আইসল্যান্ডের অর্থনীতি বর্তমানে খারাপ অবস্থায় নেই। মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে দেশটি বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে। মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৯৮ হাজার ৩০০ ডলার—যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও সামান্য বেশি। বেকারত্বও তুলনামূলক কম।
Economics
নর্ডিক কল্যাণরাষ্ট্রের সুবিধা হিসেবে নাগরিকেরা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা এবং সমান হারে বেতনসহ পারিবারিক ছুটির সুবিধা পান।
তারপরও অর্থনৈতিক উদ্বেগ রয়েছে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের ক্ষত এখনো মানুষের মনে গভীর। ছোট জাতীয় মুদ্রা ক্রোনার অস্থিরতা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ায়। জীবনযাত্রার ব্যয়ও অত্যন্ত বেশি।
ইইউপন্থীদের মতে, ক্রোনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ কঠিন করে তোলে। দেশের বড় বড় খাতেও প্রতিযোগিতা কম।
আইসল্যান্ডের থিংকট্যাংক ভার্দার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রাগনার হিয়ালমারসন বলেন, "ইইউতে যোগ দিলে অর্থনীতিতে আরও শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা আসতে পারে। অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে।" তাঁর মতে, তেল আমদানি ও বিতরণ তিন-চারটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। বড় অন্যান্য খাতেও একই চিত্র।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, আইসল্যান্ড ইইউর কাছে আকর্ষণীয় প্রার্থী। দেশটি ধনী হওয়ায় ইইউ বাজেটে নিট অবদানকারী হতে পারে। আবার বলকান অঞ্চলের সম্ভাব্য সদস্যদের তুলনায় দেশটির সংস্কারের প্রয়োজনও কম।
GeographicReference
তাই মৎস্য ও কৃষিনীতি নিয়ে আইসল্যান্ডকে বিশেষ কিছু ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের মোলারের মতে, আইসল্যান্ডের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার ব্যাপারে ইইউর আগ্রহ থাকতে পারে। এর মধ্যে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়টিও রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত পথটি সহজ নয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এলেও মাসের পর মাস চলা আলোচনায় যেকোনো সময় সমঝোতা ভেস্তে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আইসল্যান্ডকে নিজেদের দলে টানতে ইইউ কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত।
আর তার পরের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—সেই চুক্তি আইসল্যান্ডবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
আজকের গণভোট তাই শুধু ইইউর সঙ্গে আলোচনার দরজা খুলবে না; এটি বদলে যাওয়া আর্কটিক ভূরাজনীতিতে আইসল্যান্ড কোন দিকে দাঁড়াতে চায়, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন