০৫:৪৯ এম
প্রচণ্ড গরমে কেউ স্বাভাবিকভাবে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, আবার কেউ অল্প সময় রোদে থাকলেই ক্লান্ত, দুর্বল কিংবা অস্বস্তিবোধ করেন। একই পরিবেশে থেকেও মানুষের গরম অনুভব করার মাত্রা কেন ভিন্ন হয়— এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে শরীরের ভেতরের নানা শারীরিক অবস্থার মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আবহাওয়ার তাপমাত্রাই নয়, বরং কিছু স্বাস্থ্যসমস্যা শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। ফলে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি গরম অনুভূত হয়, অতিরিক্ত ঘাম হয়, মাথা ঘোরে কিংবা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই গরমের সময়ে নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. থাইরয়েডের সমস্যা: শরীরের ভেতরেই তৈরি হয় অতিরিক্ত তাপ। বিশেষ করে হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) দ্রুততর হয় এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপ উৎপন্ন হয়। ফলে— সবসময় গরম অনুভূত হতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। অস্থিরতা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
আরও পড়ুন: সোমবার রাজধানীর যেসব এলাকার মার্কেট বন্ধ থাকবে
২. ডায়াবেটিস: তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বাধা। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস শরীরের স্নায়ুতন্ত্র ও ঘামগ্রন্থির কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে শরীর প্রয়োজনমতো ঘাম তৈরি করতে পারে না, যা স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে— গরমে অস্বস্তি বেড়ে যায়। শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে।
৩. হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ: রক্তসঞ্চালনের সীমাবদ্ধতা। হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের শরীরে রক্তপ্রবাহ অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। শরীরের অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করে দেওয়ার জন্য কার্যকর রক্তসঞ্চালন প্রয়োজন হয়। যখন এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে, তখন— শরীরে তাপ জমে থাকে। গরম বেশি অনুভূত হয়। ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে।
৪. স্থূলতা: শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত তাপ। অতিরিক্ত ওজন বা স্থুলতা গরমের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি প্রাকৃতিকভাবে তাপ ধরে রাখে, ফলে শরীর সহজে ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে— দ্রুত ঘাম হয়। হাঁপিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। দীর্ঘ সময় গরম সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৫. অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা: গরমে বাড়ে দুর্বলতা। রক্তস্বল্পতায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে সমস্যা হয়। এর ফলে গরমের সময়ে শরীর দ্রুত শক্তি হারিয়ে ফেলে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো— মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা, অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া।
আরও পড়ুন: রোববার রাজধানীর যেসব এলাকার মার্কেট বন্ধ থাকবে
৬. মেনোপজ ও হরমোনজনিত পরিবর্তন: হঠাৎ গরম লাগার অন্যতম কারণ। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে ‘হট ফ্ল্যাশ’ নামে পরিচিত একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়। এ সময়— হঠাৎ শরীর গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত ঘাম হয়। স্বাভাবিক আবহাওয়াতেও অস্বস্তি তৈরি হয়। এছাড়া গর্ভাবস্থা এবং মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়েও হরমোনের ওঠানামার কারণে শরীর তাপমাত্রার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
৭. পানিশূন্যতা: গরম সহ্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ঘাম উৎপাদন কমে যায়। ফলে— শরীর ঠান্ডা হতে পারে না। গরম আরও বেশি অনুভূত হয়। হিট এক্সহস্টশন ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
৮. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। অনেকেই জানেন না যে কিছু ওষুধও গরম সহ্য করার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে— উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ, ডাইইউরেটিক (মূত্রবর্ধক) ওষুধ, মানসিক রোগের কিছু ওষুধ। এসব ওষুধ শরীরের পানি ও খনিজের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে, ফলে গরমে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
গরমে এসব সমস্যা থাকলে কী করবেন? যারা উপরের যেকোনো স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে, তাদের গরমের সময়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। করণীয়— পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান করুন। প্রয়োজন হলে ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণ করুন। দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলুন। হালকা রঙের ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। দীর্ঘ সময় বাইরে অবস্থান না করুন। অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন। শীতল ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে থাকার চেষ্টা করুন।
আরও পড়ুন: নখের পরিবর্তনেই মিলতে পারে অসুস্থতার ইঙ্গিত, যা বলছেন চিকিৎসকেরা
আরও পড়ুন: শুধু পানি নয়, ডিহাইড্রেশন রোধে দরকার ইলেকট্রোলাইট
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন? গরমের কারণে যদি— মাথা ঘোরা, অত্যধিক দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘাম, বমিভাব, শ্বাসকষ্ট, দ্রুত হৃদস্পন্দন এর মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এগুলো গুরুতর পানিশূন্যতা বা হিট স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
গরমের তীব্রতা সবার জন্য এক রকম হলেও তা সহ্য করার ক্ষমতা সবার সমান নয়। থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা, রক্তস্বল্পতা, হরমোনজনিত পরিবর্তন কিংবা পানিশূন্যতার মতো বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা একজন মানুষকে অন্যদের তুলনায় বেশি গরম অনুভব করাতে পারে। তাই শুধু আবহাওয়াকে দায়ী না করে নিজের স্বাস্থ্যগত অবস্থাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সচেতনতা, পর্যাপ্ত পানি পান, সঠিক জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে গরমজনিত ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে সুস্থ ও নিরাপদ থাকা সম্ভব।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক, হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
আরও পড়ুন: শনিবার রাজধানীর যেসব মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ থাকবে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন