০৩:৩৩ পি.এম
শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির মেলবন্ধনকে ধারণ করে গড়া নড়াইল জেলা। মোঘল আমল কিংবা জমিদারি শাসনামলের স্মৃতিবাহী এই জনপদে একসময় অসংখ্য প্রাচীন বৃক্ষ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু কালের বিবর্তন এবং মানুষের নির্মমতায় হারাতে বসেছে এসব সবুজ ঐতিহ্য। গত এক দশকে উন্নয়ন এবং অবহেলার অজুহাতে অন্তত পাঁচ শতাধিক শতবর্ষী প্রাচীন গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে যে গুটিকয়েক গাছ জেলাজুড়ে টিকে আছে, সেগুলোও এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। স্থানীয়রা ও পরিবেশবাদীরা দাবি করেছেন, দ্রুত তালিকা তৈরি করে এই জীবন্ত ইতিহাসগুলোকে সংরক্ষণ করা উচিত।
অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, তৎকালীন জমিদাররা নড়াইল অঞ্চলের পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এবং ছায়াময় আবাসের প্রয়োজনও বৈশিষ্ট্য দেওয়ার জন্য রোপণ করেছিলেন বিশাল আকৃতির তেঁতুল, আম, গাব, হিজল, পাকুড় ও বটবৃক্ষ। জমিদাররা দেশ ছাড়লেও এই গাছগুলো শত বছর ধরে টিকে ছিল। কিন্তু গত ১০ বছরে জেলার বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাসজমি এবং নদ-নদীর তীর থেকে অন্তত ৫০০টি প্রাচীন গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে।
বর্তমানে পুরো জেলায় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে মাত্র অর্ধশতাধিক গাছ টিকে আছে। তবে দুঃখজনকভাবে, জেলা বন বিভাগের কাছে এসব গাছের সুনির্দিষ্ট তালিকা বা পরিসংখ্যান নেই। বন অধিদপ্তর থেকে বিভিন্নসময় ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী বৃক্ষের তালিকা তৈরির নির্দেশনা থাকলেও নড়াইল বন বিভাগের উদাসীনতায় তা আলোর মুখ দেখেনি।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
প্রাচীন এই গাছগুলোর সঙ্গে নড়াইলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবেগ জড়িয়ে আছে। বৃক্ষপ্রেমী যাযাবর মনির বলেছেন, "এই গাছের ছায়াতেই একসময় গ্রামের সালিশ-বিচার ও সামাজিক বৈঠক হতো।" কোনো কোনো গাছের নিচে বসেই শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন, কবিরা কবিতা লিখেছেন, গীতিকাররা গান বেঁধেছেন।
লোহাগড়ার সমাজকর্মী হাসান মাহমুদ বলেছেন, "প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবহেলা, ভূমি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন এবং সচেতনতার অভাবে আমাদের চারপাশের পুরোনো বৃক্ষগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।" সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম বলেছেন, "এসব বৃক্ষকে শুধু পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে নয়, জেলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।" বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি মো. শাহ আলম বলেছেন, এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। তিনি অবিলম্বে টিকে থাকা গাছগুলোর তালিকা করে তা সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
বিজ্ঞান ও পরিবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক কেয়া রেণু রায় বলেছেন, "একটি শতবর্ষী গাছ তৈরি হতে শত বছর সময় লাগে, কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি কেটে ফেলা হয়।" এসব গাছ কেবল অক্সিজেন নয়; জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং অসংখ্য পাখি ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থল হিসেবেও কাজ করে।
নড়াইল সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ফরেস্ট রেঞ্জার (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) কাজী ইশতিয়াক রহমান জানিয়েছেন যে, বর্তমানে তাদের কাছে কোনো তালিকা নেই। তবে দ্রুত একটি তালিকা তৈরি করে গাছগুলো সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, নড়াইলের জেলা প্রশাসক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম জানিয়েছেন যে, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, জেলার শতবর্ষী গাছগুলো সংরক্ষণ করা হবে এবং এ ব্যাপারে দ্রুত কাজ শুরু হবে। তিনি জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে নড়াইল সদর, কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলার তিনটি বিশেষ গাছের চারপাশে ইটের গাঁথুনি দিয়ে পথচারীদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে, তিনি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রাচীন গাছগুলোও নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে ‘দাদা ভাই বাহিনী’র বন্দুকযুদ্ধে ৫ জেলে উদ্ধার
পরিকল্পনার অভাব এবং চরম অবহেলার কারণে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে নড়াইলের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। অবশিষ্ট গাছগুলো রক্ষায় এখনই যদি কঠোর এবং স্থায়ী পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই প্রাচীন বৃক্ষগুলো কেবলই "গল্প" বা "স্মৃতি" হয়ে থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন