০৮:০২ পি.এম
রাশিয়ার ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে বর্তমানে ইউক্রেনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় যা অস্ত্র তা হলো প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র। দীর্ঘদিনের হামলার ফলস্বরূপ এই ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার কারণে নতুন সমাধানের সন্ধানে হাঁটছে কিয়েভ।
এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য অনুমতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে বাড়ানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
তুরস্কে উত্তর আটলান্টিক জোটের শীর্ষ সম্মেলনে বুধবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দেবে এবং এ প্রযুক্তি ব্যবহারের পদ্ধতিও শেখাবে। তবে তিনি এটি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মজুত থেকে এসব ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে না।
আরও পড়ুন: প্রথমবারের মতো শুরু হচ্ছে এক্সপ্যাট ওয়ার্ল্ড কাপ
যদিও উৎপাদন কবে শুরু হবে, সেই সম্পর্কে ট্রাম্প কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেননি। তবে ইউক্রেন ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে, তারা যত দ্রুত সম্ভব দেশীয়ভাবে এ প্রযুক্তি আয়ত্ত করার চেষ্টা করবে।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন বলেন, স্বল্পমেয়াদে ইউক্রেনের হাতে নতুন কিছু আসার সম্ভাবনা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার দেশটির ব্যালিস্টিক ও প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অগ্রগতি অনেক দ্রুত ঘটাতে পারে।
তার মতে, ইউক্রেন শুরুতে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল ও সহজ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের পথ নিতে পারে। এ ধরনের উৎপাদন এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে শুরু করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো জানান, এমন কর্মসূচি পূর্বেও চালু থাকতে পারে তবে এখন সেটি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন মূলত প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র অংশ উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেবে। কারণ পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি উৎক্ষেপণযন্ত্র, দূরপাল্লার শনাক্তকারী ব্যবস্থা এবং চলমান নিয়ন্ত্রণযানও রয়েছে।
আরও পড়ুন: মিরপুরে কিশোর গ্যাংয়ের হোতা তিন ভাই গ্রেফতার
যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াইয়ের ধরন বদলে যাচ্ছে এটি একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আগের চেয়ে আরো প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খারকিভ এলাকায় একটি নজরদারি ড্রোনের সহায়তায় রুশ সেনার অবস্থান শনাক্ত করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিস্ফোরকবাহী আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছে, যা এই পরিবর্তনের উদাহরণ।
এক ইউক্রেনীয় সামরিক কমান্ডার জানিয়েছেন যে, তিনি একই সময়ে ২০ থেকে ৩০টি ড্রোনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচলিত সম্মুখসমরের ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক পাভেল লুজিনের মতে, যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সেনা, কমান্ডার ও অস্ত্রব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। এর ফলে যুদ্ধ পরিচালনার গতি ও কার্যকারিতা বেড়ে যাচ্ছে।
মানবশক্তির সংকটের কারণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। সেনাসংকট ও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ার কারণে ইউক্রেন ক্রমশ ভূমিচলমান রোবটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। রোবটগুলো শত্রুর বাংকার ধ্বংস, যন্ত্রচালিত অস্ত্র পরিচালনা, খাদ্য ও গোলাবারুদ পৌঁছে দেওয়া এবং আহত সেনাদের উদ্ধার সহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ভারতের উত্তরাখণ্ডে মাদরাসায় জুমার ছুটি বাতিল, বিজেপি সরকারের নতুন নিয়মে বিতর্ক
ইউক্রেনের একটি রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইহোর চাইকিভস্কি জানান, সেনাসংকটের কারণে হয়তো সৈন্যদের সম্মুখসারিতে পাঠানো হতো। কিন্তু মানবহানির সংখ্যা কমানোর জন্য রোবটের ব্যবহার বৃদ্ধি করা হয়েছে।
একইভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ড্রোনও দ্রুত যুদ্ধের চিত্র বদলে দিচ্ছে। গুগলের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এরিক শ্মিটের প্রতিষ্ঠানের তৈরি 'হর্নেট' নামে ড্রোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রুশ জ্বালানিবাহী যান, রসদবাহী ট্রাক ও সামরিক বহর শনাক্ত করতে সক্ষম। ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা এসব ড্রোনগুলোকে সহজে থামাতে পারে না।
এক ইউক্রেনীয় ড্রোনচালক বলেন, ভবিষ্যতে শত্রু সেনা শনাক্ত করার কাজও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে চলে যাবে। তখন শত্রুর লুকিয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে, ইউক্রেনের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী করেনি। ফলস্বরূপ, বিশাল ভৌগোলিক এলাকায় কার্যকর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: ভারতের একক বৃহত্তম তেল শোধনাগার পরিদর্শনে রুবিও, কিন্তু কেন?
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কোর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা কার্যকরভাবে সব দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। এজন্য আরও বিস্তৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
গত মঙ্গলবার ইউক্রেনের ড্রোন হামলার পর সাইবেরিয়ার ওমস্ক শহরের রাশিয়ার বৃহত্তম তেল শোধনাগারগুলো অন্যতম একটি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। একই দিনে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, এই যুদ্ধের বিজয় আকাশে নির্ধারিত হবে। তার ভাষায়, এখন ইউক্রেন ইতোমধ্যে আকাশযুদ্ধে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
তবে ইউক্রেনের সাবেক সেনাপ্রধান এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেরি জালুঝনি সতর্ক করে বলেছেন যে, কেবল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্ভব নয়। কারণ রাশিয়ারও সমান কিংবা আরও বড় আকারে পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
শান্তি আলোচনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা বিরাজমান। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কবে আবার শান্তি আলোচনায় ফিরবেন, এটি এখনো পরিষ্কার নয়। যদিও ইউক্রেন অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে, তবে এসব সাফল্য কখন রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ নিবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
আরও পড়ুন: থাইল্যান্ডের ই-ভিসার আবেদন ৩ দিন বন্ধ, জানা গেল কারণ
কিয়েভভিত্তিক পেন্টা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর মতে, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে শান্তি আলোচনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত যুদ্ধবিরতি, ইউক্রেনের কাছে ছাড় আদায় নয়। তার মতে, ক্রেমলিন এখনো এ অবস্থানের জন্য প্রস্তুত নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সেই দিকে ঝুঁকছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন