১২:৩১ পি.এম
১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট, জাপানের নাগাসাকি শহরে যুক্তরাষ্ট্র একটি প্লুটোনিয়াম পারমাণবিক বোমা ফেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে এই হামলায় শহরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
হামলার ৩০ বছর পর বিবিসিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বোমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ফিলিপ মরিসন জানান, কেন সেই সময় পারমাণবিক বোমার ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। তিনি একই সাথে আরো পারমাণবিক হামলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
মরিসন বলেন, ‘মানবতার প্রতি উদ্বেগের অভাব ছিল না। বরং মানবতার প্রতি উদ্বেগই এর কারণ ছিল।
আরও পড়ুন: ইইউ’র শীর্ষ মানবাধিকার পুরস্কার জিতল আইসিসি
সম্ভবত সেটাই ছিল পাপ।’ ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার ৩০ বছর পর মরিসন বিবিসির কাছে সেই সময়ের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
তিনি জানান, নাগাসাকিতে ওই নজিরবিহীন হামলার আগের দিন ও সপ্তাহগুলোতে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মরিসন প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য মিত্রশক্তির গোপন কর্মসূচি ‘ম্যানহাটন প্রকল্প’-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি নিউ মেক্সিকোর লস অ্যালামোস গবেষণাগারে কাজ করতেন। গবেষণাগারটির নেতৃত্বে ছিলেন তার সাবেক শিক্ষক জে রবার্ট ওপেনহাইমার।
১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই প্রথম পারমাণবিক বোমার ‘ট্রিনিটি’ পরীক্ষা হয়। মরিসন সেই পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলেন। পরীক্ষার জন্য প্লুটোনিয়াম কোরটি তিনি গাড়িতে করে নিউ মেক্সিকোতে নিয়ে যান।
আরও পড়ুন: মীর শাহে আলম: বিএনপিতেও গুপ্ত ও জামায়াত-আওয়ামী লীগে রয়েছে
পরে তিনি সাইপানের দক্ষিণে অবস্থিত টিনিয়ান দ্বীপে যান। সেখানে নাগাসাকিতে ব্যবহৃত ‘ফ্যাট ম্যান’ প্লুটোনিয়াম বোমা তৈরির কাজে তিনি সহযোগিতা করেন। হিরোশিমায় বোমা হামলার মাত্র তিন দিন পর, ৯ আগস্ট তিনি একটি বি-২৯ বোমারু বিমানে বোমাটি তোলার কাজ তদারক করেন।
টিনিয়ান দ্বীপে মার্কিন বাহিনী একটি বিশাল বিমানঘাঁটি তৈরি করেছিল। মরিসন এটিকে ‘বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবন্দর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে একটি সিনেট কমিটির কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ‘একটি এবড়োখেবড়ো সমভূমি সমতল করতে এবং ছয়টি রানওয়ে তৈরি করতে একটি বিশাল প্রবাল শৈলশিরার অর্ধেক কেটে ফেলা হয়েছিল। প্রতিটি রানওয়ে ছিল প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ।’
মরিসন তার সাক্ষ্যে জাপানের শহরগুলোতে বোমা হামলার বিশাল প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন বন্দরে হাজার হাজার টন বিমান জ্বালানি নিয়ে ট্যাংকার আসত। বড় বড় বিমান বিশাল রানওয়ে থেকে উড়ে যেত। প্রতি ১৫ সেকেন্ডে একটি করে বি-২৯ বিমান আকাশে উঠত। এভাবে দেড় ঘণ্টা ধরে হামলা চলত। প্রায় এক হাজার বি-২৯ বিমান একের পর এক হামলা চালিয়ে একটি শহরের বিশাল এলাকা পুড়িয়ে দিত।
তবে পারমাণবিক বোমা হামলার প্রস্তুতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মরিসন বলেন, সেখানে জাহাজে করে বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ আনা হয়নি। বিপুলসংখ্যক কর্মী ও বোমার স্তূপের বদলে ছিলেন লস অ্যালামোসের মাত্র ২৫ জনের মতো কর্মী। তাদের সঙ্গে ছিল কয়েকটি পরীক্ষাগারে রূপান্তরিত ঢেউখেলানো ইস্পাতের কুঁড়েঘর ও একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত ভবন।
আরও পড়ুন: জ্বালানি ও সার সরবরাহে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় আলজেরিয়া
মরিসন জানান, মধ্যরাতের পর হামলার প্রস্তুতি শুরু হয়। তখন পুরো এলাকা প্রায় জনশূন্য ছিল। এরপর একটি বিমান রানওয়ে থেকে উড়ে জাপানের একটি শহরের দিকে রওনা হয়।
বিভিন্ন হিসাবে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও ধারণা করা হয়, নাগাসাকিতে বোমা হামলার প্রথম বিস্ফোরণে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন। পরবর্তী পাঁচ বছরে এই হামলার কারণে সরাসরি এক লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। হিরোশিমায় তাৎক্ষণিকভাবে অন্তত ৮০ হাজার মানুষ নিহত হন। পরে গুরুতর দগ্ধ, আহত ও তেজস্ক্রিয়তাজনিত অসুস্থতায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে পৌঁছায়।
মরিসন সরকারি একটি বৈজ্ঞানিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন দলের সদস্য হিসেবে হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে যান। হিরোশিমার একটি ঘটনা তার বিশেষভাবে মনে আছে। তিনি বলেন, একজন জাপানি কর্মকর্তা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘একটি মাত্র বোমায় এসব ধ্বংস হয়েছে। এটা অসহনীয়।’
মরিসন বলেন, একটি বিমান থেকে ফেলা একটি বোমাই শহরের বহু বর্গমাইল এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এক হাজার বিমানের হামলার তুলনায় এটি ছিল আরো ধ্বংসাত্মক এবং মানুষকে প্রতিরোধ বা পালানোর সুযোগও কম দিয়েছিল। তবুও মরিসন আশা করেছিলেন, যুদ্ধে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করতে হবে না। তিনি লস অ্যালামোসের একদল তরুণ পদার্থবিজ্ঞানীকে নিয়ে জাপানে বোমা ব্যবহারের আগে সেটি প্রকাশ্যে প্রদর্শনের পক্ষে প্রচার চালান।
আরও পড়ুন: কিশোরের চোখের ওপরে দাঁত গজানোর বিরল ঘটনা
১৯৭৫ সালে বিবিসির মেলভিন ব্র্যাগকে মরিসন বলেন, তিনি মরুভূমিতে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানাতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘যুদ্ধের পরিস্থিতিতে, সেটা ছিল এক অলীক কল্পনা।’
পদার্থবিজ্ঞানী মরিসন বলেন, নাৎসি জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেলেও পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ থামেনি। কারণ তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল এবং প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের সঙ্গে বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ তখনও চলছিল। আমরা প্রশান্ত মহাসাগরে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। তাই এটি থামানো অসম্ভব ছিল।’
মরিসনের মতে, পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বদলানোর বড় সুযোগ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের বেঁচে থাকা। তিনি ১৯৪৫ সালের এপ্রিলে মারা যান।
আরও পড়ুন: বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার আশঙ্কায় বহু সরকারি ও কোম্পানির ওয়েবসাইট বন্ধ
মরিসন বলেন, ‘রুজভেল্ট বেঁচে থাকলে আমেরিকার অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ ছিল। তিনি এমন এক সময় মারা যান, যখন আমরা জানতাম না বোমাটি কাজ করবে কি না এবং এটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিও চূড়ান্ত হয়নি।’
তার মতে, এই প্রকল্প থামানোর মতো যথেষ্ট ক্ষমতা ও প্রভাব সরকারের মধ্যে একমাত্র রুজভেল্টেরই ছিল। রুজভেল্টের মৃত্যুর পর হ্যারি এস. ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হন। তিনি ম্যানহাটন প্রকল্প সম্পর্কে আগে জানতেন না। শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তাকে এ বিষয়ে জানানো হয়। এর তিন মাসের কিছু বেশি সময় পর তিনি জাপানে পারমাণবিক বোমা হামলার অনুমোদন দেন।
মরিসন বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি ট্রুম্যান নিয়েছিলেন। তবে এটাও বলা যায়, সেই সিদ্ধান্তই তাকে তৈরি করেছিল।’ তার মতে, এত বড় একটি চলমান প্রকল্প থামিয়ে দেওয়া ট্রুম্যানের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও সাহসী পদক্ষেপ হতো। রুজভেল্টের মৃত্যুর সঙ্গে সেই সুযোগও কার্যত শেষ হয়ে যায়।
পরপর দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি কাজ করেছিল বলে মনে করেন মরিসন। তিনি বলেন, তখন এগুলোকে আলাদা করে প্রথম ও দ্বিতীয় বোমা হিসেবে দেখা হয়নি। কমান্ডারদের নির্দেশ ছিল, প্রথম বোমা ফেলার পর যত দ্রুত সম্ভব দ্বিতীয় বোমাটিও ফেলা।
আরও পড়ুন: রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিদের মৃত্যু, জবাবদিহির দাবি মানবাধিকার সংগঠনের
মরিসনের মতে, প্রথম বোমার ভয়াবহ প্রভাব দেখার পর দ্বিতীয় হামলা ঠেকাতে ওয়াশিংটনের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতো। এর জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পরিস্থিতির জটিলতা বোঝা এবং সামরিক কমান্ডারদের কাছে নতুন নির্দেশ পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা দরকার ছিল।
আরো পারমাণবিক হামলার পরিকল্পনাও ছিল। মরিসনের বক্তব্য অনুযায়ী, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পারমাণবিক বোমা ফেলার পরও জাপানের ওপর আরো হামলার পরিকল্পনা ছিল। প্রয়োজনে এক বছর পর্যন্ত এসব বোমা ব্যবহারের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল।
মরিসন বলেন, ‘মূল সিদ্ধান্ত ছিল, প্রয়োজনে আমরা এক বছর ধরে বোমা ফেলতে থাকব। আমাকে এর জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হয়েছিল। পরিকল্পনা, সময়সূচি, আমার অনুপস্থিতিতে কাজ করার জন্য একজন ব্যক্তি এবং যাতায়াতের সব ব্যবস্থাও প্রস্তুত ছিল।’
তবে হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ নিজের চোখে দেখার পর এই কাজ চালিয়ে যেতে পারতেন কি না, তা নিয়ে মরিসনেরও সন্দেহ তৈরি হয়। তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা বোমার স্বল্পমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু বই ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জানা আর বাস্তবে মানুষের মৃত্যু ও ধ্বংস দেখার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
হিরোশিমা হামলার রাতে টিনিয়ানে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। হিরোশিমায় বোমা হামলার রাতে প্রশান্ত মহাসাগরের টিনিয়ান দ্বীপের মার্কিন ঘাঁটিতে একটি বড় পার্টির আয়োজন করা হয়। তবে বেশিরভাগ বিজ্ঞানী সেখানে যাননি।
মরিসন বলেন, বিমানবাহিনীর সদস্য ও সৈন্যরা মদ্যপান করছিলেন। তারা জানতেন, যুদ্ধ শেষের দিকে এবং হামলাটিকে বড় বিজয় হিসেবে দেখছিলেন। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা বিষণ্ণ মুখে বসে ছিলেন এবং পৃথিবীর শেষ নিয়ে ভাবছিলেন।
তবে বোমা হামলার আগে ম্যানহাটন প্রকল্প থেকে সরে আসার কথা মরিসন ভাবেননি। তিনি বলেন, ‘এর বিরুদ্ধে দৃঢ় বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও, এর চেয়ে ভিন্নভাবে কী করা সম্ভব ছিল, তা আমি বুঝতে পারিনি। আমি কোনো সময়ই থামার কথা ভাবিনি।’
জার্মানির বিরুদ্ধেও বোমা ব্যবহারের প্রস্তুতি। নাৎসি জার্মানির পরাজ্যের আগে পারমাণবিক বোমা প্রস্তুত থাকলে মিত্রশক্তি বার্লিনে সেটি ফেলত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মরিসন বলেন, ‘অবশ্যই, মুহূর্তের মধ্যেই। আমরা মূলত জার্মানদের ভয় পেতাম এবং তারাই ছিল আমাদের শত্রু।’
যুদ্ধের পর মরিসন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যাপক হন। পরে তিনি ‘তৃতীয় বোমা নয়’ আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধে কাজ করেন।
১৯৪৫ সালে সিনেটে দেওয়া এক সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পের অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতো আমিও নিশ্চিত যে আরেকটি যুদ্ধ হতে দেওয়া উচিত নয়।’ মরিসন মনে করতেন, জাপানে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের আগে দেশটিকে যথাযথ সতর্কবার্তা দেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, জাপানকে যথাযথ ও উপযুক্ত সতর্কবার্তা না দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
