০৭:৫১ পি.এম
কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ের সময় দড়ি ছিঁড়ে নিহত অক্ষর সৌভিক রায়ের মরদেহ সোমবার সকাল ১১টা ১১ মিনিটে খুলনা নগরীর যশোর রোডের ভাড়া বাসার সামনে পৌঁছায়। এ সময় স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছবিটি : কালের কণ্ঠ
গোটা পরিবার শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছে। তবে সেই অশ্রু বিগত শোকের মধ্যে ক্ষোভের আগুন বেঁচে রয়েছে।
অক্ষর সৌভিক ছিলেন পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যু কোনোভাবে মেনে নিতে পারছে না তার পরিবার। তবু ছোট বোন শীর্ষা রায় চোখের জলে ভাইয়ের মুখাগ্নি দিতে বাধ্য হয়েছেন।
আরও পড়ুন: মহাখালীতে ট্রেনের ধাক্কায় যুবক মো. রায়হান নিহত
কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংয়ের সময় দড়ি ছিঁড়ে মারা যাওয়া খুলনার তরুণ অক্ষর সৌভিক রায়ের মরদেহ সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে ১১টা ১১ মিনিটে লাশবাহী গাড়িতে খুলনায় পৌঁছায়।
মরদেহটি প্রথমে নগরীর শহীদ হাদিস পার্কের পাশে ছয়তলা ভবন দোলনের সামনে কিছু সময় রাখা হয়। পরে ভবনটির চতুর্থ তলার ভাড়া বাসা থেকে শোকাহত মা, ছোট বোন ও অন্যান্য স্বজনরা নেমে আসেন। মৃত অক্ষরকে একনজর দেখতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন। তাদের অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না। শোকে মা শুক্লা রায় বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন।
অরা পরবর্তী সময়ে মরদেহ নিয়ে যান রূপসা মহাশ্মশানে। দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে অক্ষরের চাচা সাত পাক ঘুরে আগুনের মশাল তুলে দেন ছোট বোন শীর্ষা রায়ের হাতে। ঠিক দু'মিনিট পর, দুপুর ১২টা ৩৬ মিনিটে ভাইয়ের চিতায় মুখাগ্নি করেন শীর্ষা।
আরও পড়ুন: মহেশপুর সীমান্তে ভারতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা, নারীসহ আটক ১২
এই অশ্রুসিক্ত মুহূর্তে অক্ষরকে সর্বশেষ বিদায় জানানো হয়।
মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেন, অক্ষরের ভগ্নিপতি আলিমুজ্জামান সিফাত। তিনি বলেন, প্যারাসেইলিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই কক্সবাজারে ব্যবসা চালানো হচ্ছে। এই অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছেন অক্ষর। ফলে তার বোন কক্সবাজার সদর থানায় লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।
আলিমুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, দুর্ঘটনার দায় শুধুমাত্র প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের? তার অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির অভাব ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা অক্ষরের মৃত্যুর কারণ হয়েছে।
একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তার মা ও বোন।
আরও পড়ুন: রংপুরের কাউনিয়ায় পূজামণ্ডপে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তরুণের মৃত্যু
আলিমুজ্জামান জানান, প্যারাসুটের দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার পর অক্ষর সাগরের জলে পড়েন এবং মারা যান। ঘটনার ভিডিও ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরে বলা হয়েছে অক্ষর যে প্যারাসেইলিংয়ে উঠেছিলেন, সেটি অবৈধ ছিল। যদি সেটি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কিভাবে পরিচালনা করা হচ্ছিল—সেই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে দিতে হবে।
‘মানুষ আনন্দ ও বিনোদনের জন্য কক্সবাজারে যায়। সেখানে বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে ভেবে পর্যটকরা এসব সেবা গ্রহণ করেন। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সেই দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। তাই জেলা প্রশাসন ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে’—এ কথা বলেন আলিমুজ্জামান। তিনি অক্ষরের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের সঠিক বিচার দাবি করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের জুনে অক্ষরের বাবা মারা যান। তারপর থেকেই পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন অক্ষর। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে বর্তমানে লোয়ার যশোর রোডের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন তারা। অক্ষরের মৃত্যুতে পরিবারটি এখন গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছে।
অক্ষরের স্কুলবন্ধু রিফাত হাসান শুভ বলেন, ‘প্রতিটি প্রাণের মূল্য আছে। আমরা জীবনের মূল্য চাই। অক্ষর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিত্ব ছিল। এখন তার মা ও দুই বোন কিভাবে টিকে থাকবে? সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।’
আরও পড়ুন: স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রতীক থাকবে না, প্রার্থী পক্ষে কাজ করতে হবে
রিফাত জানান, গত ৩১ জুলাই ছিল অক্ষরের প্রয়াত বাবার জন্মদিন। সেদিন বাবাকে স্মরণ করে ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছিলেন অক্ষর। পরদিনই প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
অন্য একজন বন্ধু মোস্তফা আমিন তনু বলেন, ‘আগের দিনও অক্ষরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। পরদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুর মৃত্যুর ভিডিও দেখতে হয়েছে। আমার বন্ধু তো আর ফিরে আসবে না।’
তনুর অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের আচরণও হতাশাজনক ছিল। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা গাড়িতে উঠে চলে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্বজনদের দাবি, অক্ষরের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি তার পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে কক্সবাজারে প্যারাসেইলিংসহ সকল ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পর্যটন কার্যক্রমে কঠোর নিরাপত্তা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এমন শোক আর কোনো পরিবারকে সহ্য করতে না হয়।
আরও পড়ুন: মধ্যনগরে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আর্থিক অনুদান দিলেন যুবদল নেতা মোঃ রনি মিয়া
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন