১১:৪৪ পি.এম
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি কৃষি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে বিতরণ না করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ১০ থেকে ১১ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থের যথাযথ ব্যবহার না করে আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক (তদন্ত) বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন তাঁরা।
অভিযোগপত্রে বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের সাবেক উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বরিশাল সদর উপজেলায় কর্মরত উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা রাসেল সিকদার, বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল ইসলাম ও উৎপল চন্দ্র দাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সরকারি কৃষি প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কৃষকদের আধুনিক কৃষিপদ্ধতিতে উদ্বুদ্ধ করা, উন্নত জাতের ফসল উৎপাদন, কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং মাঠপর্যায়ে প্রদর্শনী স্থাপনের জন্য সরকার বিভিন্ন সময় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এসব প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষির সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
কিন্তু বাবুগঞ্জে এসব প্রকল্পের কয়েকটির বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে প্রদর্শনী বাস্তবায়ন না করেই প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। আবার কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ ও কৃষি উপকরণ যথাযথভাবে বিতরণ না করে কাগজপত্রে ব্যয়ের হিসাব দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
কৃষকদের দাবি, প্রকল্পের বরাদ্দ, বাস্তবায়ন, উপকারভোগীদের তালিকা, প্রদর্শনীর স্থান এবং ব্যয়ের হিসাব যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়, বরং কৃষকদের ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত করার শামিল।
অভিযোগপত্র ও স্থানীয় কৃষকদের বক্তব্যে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব অনিয়মের সঙ্গে কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে। তাঁদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অনিয়ম হলেও যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, কৃষি বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ বরাদ্দের পর তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত না হলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ ঘটনা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে কৃষক দলের পক্ষ থেকে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করা হয়।
কিন্তু অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংবাদ প্রকাশ, প্রতিবাদ এবং মানববন্ধনের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, একটি মহল ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ তদন্ত না হলে প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যেতে পারে। তাই শুধু মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং প্রকল্পভিত্তিক তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের নিষ্পত্তি চান তাঁরা।
আরও পড়ুন: সিলেটে প্রেমের টানে চীনা নাগরিকের বিয়ে, উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ হেফাজতে নেয়
এদিকে, আলোচিত ঘটনার পর বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পারস্পরিক বদলি হয়েছে এবং তিনি দ্রুত উপজেলা ত্যাগ করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এই বদলির সঙ্গে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কৃষকদের প্রশ্ন, বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব, প্রকল্প বাস্তবায়নের নথিপত্র এবং উপকারভোগীদের তালিকা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে কোন কোন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা জনসম্মুখে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপপরিচালকের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগে নাম আসা রাসেল সিকদার, মো. মঞ্জুরুল ইসলাম ও উৎপল চন্দ্র দাসের বক্তব্যও এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে গত ১০ থেকে ১১ বছরের প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ, অর্থ ছাড়, ব্যয়ের ভাউচার, বাস্তবায়ন প্রতিবেদন, প্রদর্শনী কার্যক্রম, উপকারভোগীদের তালিকা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি অর্থ যাতে কোনোভাবেই অনিয়ম বা দুর্নীতির মাধ্যমে অপব্যবহার না হয়, সে জন্য নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষকদের বক্তব্য, কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকার বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। সেই অর্থের প্রকৃত সুফল কৃষকের হাতে পৌঁছানোই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধান দায়িত্ব। অথচ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ কিংবা বাস্তবায়ন ছাড়াই ব্যয়ের হিসাব দেখানোর অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদক ও কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীকে বরণে খুলনা মহানগরী বর্ণিল সাজে সজ্জিত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন