০৬:৫৬ পি.এম
ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোয় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের চাকরি ছাড়ার প্রবণতা এখন আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। সম্প্রতি একসঙ্গে শতাধিক অভিজ্ঞ কর্মীর পদত্যাগের ফলে দেশের শীর্ষস্থানীয় এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের কর্মীসংকটে পড়েছে।
এই তথ্য প্রকাশ করেছে জার্মানির গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।
কেন্দ্রীয় সরকারের মহাকাশ বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরোয় ২০ হাজারেরও বেশি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৫ হাজারেরও কম কর্মী। এর মানে হলো প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পদ শূন্য পড়ে রয়েছে, যা মোট পদের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে বেশি। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, গগনযান মিশনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের লঞ্চ ভেহিকল ডিরেক্টর ভিক্টর জোসেফ টি গত ফেব্রুয়ারি মাসে পদত্যাগ করার পর এই সংকট আরও বেড়ে গেছে।
আরও পড়ুন: সুদানে ড্রোন হামলায় ২ শতাধিক প্রাণহানি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গণ-পদত্যাগের প্রধান কারণ হচ্ছে ভারতের বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের অভাবনীয় ও দ্রুত বিস্তার। ২০২০ সালে মহাকাশ খাতকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর থেকে দেশে স্টার্টআপের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪ সালে যেখানে মাত্র একটি মহাকাশ স্টার্টআপ ছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে তা ৪০০-এর উপরে যেতে চলেছে। স্কাইরুট অ্যারোস্পেস এবং অগ্নিকুল কসমসের মতো উদীয়মান কোম্পানিগুলো বিদেশি বিনিয়োগ পেয়ে বিজ্ঞানীদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিতে সক্ষম হচ্ছে। যেমন, ইসরোর একজন নবাগত বিজ্ঞানী যেখানে বছরে ১০-১২ লাখ টাকা পান, সেখানে খোদ চেয়ারম্যানের বেতন প্রায় ৩০ লাখ টাকা, অথচ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি বেতনের প্রস্তাব দিচ্ছে। এর ফলে তরুণ ও অভিজ্ঞ গবেষকেরা দলে দলে সরকারি চাকরি ছেড়ে করপোরেট দুনিয়ায় চলে যাচ্ছেন।
বেতনের পাশাপাশি ইসরোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা এবং সাম্প্রতিক কিছু ব্যর্থতাও বিজ্ঞানীদের মোহভঙ্গের একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গগনযান বা মঙ্গলযান-২-এর মতো মেগা প্রকল্পগুলোর সময়সীমা বারবার পিছিয়ে যাওয়ার কারণে কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকলের পর পর দুটি মিশন ব্যর্থ হওয়ার ফলে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মনোবল ভেঙে পড়েছে। তরুণ বিজ্ঞানীরা বর্তমানে সরকারি চাকরির ধরাবাঁধা নিরাপত্তার তুলনায় বেসরকারি খাতের চ্যালেঞ্জিং পরিবেশকে বেশি আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এদিকে, এই কর্মীসংকট ঠেকাতে মহাকাশ দপ্তর গত ১৪ জুলাই একটি কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে। নির্দেশিকার মধ্যে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যুক্ত গ্রুপ-এ বিজ্ঞানীদের পদত্যাগ বা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন এখন আর সহজে গ্রহণ করা হবে না। তবে ইসরোর সাবেক চেয়ারম্যান সি মাধবন নায়ার মনে করেন, শুধুমাত্র নিয়ম চাপিয়ে মেধাবীদের ধরে রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন আর্থিক প্রণোদনা ও কাজের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা। সাবেক বিজ্ঞানী তপন মিশ্রও এই বিষয়ে অভিমত দিয়েছেন যে, কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করার গৌরব ও অহমিকা হারিয়ে যাচ্ছে, যা ফেরত আনা জরুরি।
সরকারি এই সংকটের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি মহাকাশ খাত কিন্তু বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছে। শ্রীহরিকোটা থেকে বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি প্রথম রকেট বিক্রম-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে স্কাইরুট অ্যারোস্পেস। উল্লেখ্য, এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা পবনকুমার চন্দনা এবং নাগাভারত ডাকা দুজনেই ইসরোর সাবেক বিজ্ঞানী। এমনকি, ইসরোর সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান এস সোমনাথও সম্প্রতি অগ্নিকুল কসমস নামক স্টার্টআপের বোর্ডে যোগদান করেছেন। বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনকে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন, তবে ইসরোর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন: সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ চুরি করলে ৩ বছরের কারাদণ্ড
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন