০৬:০২ পি.এম
রাজশাহীর বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আলু পচতে শুরু করেছে। এর ফলে চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চাষি ও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, আলু পচনের জন্য হিমাগার মালিকদের অব্যবস্থাপনা ও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ দায়ী। অন্যদিকে, হিমাগার মালিকেরা দাবি করেছেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে আলু সংরক্ষণে সমস্যা দেখা দিচ্ছে এবং জেনারেটর চালানোর জন্য অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে।
চাষিদের অভিযোগ, হিমাগারগুলোর নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও জেনারেটর থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করায় পচন দেখা দিয়েছে। তাঁরা বলেন, নিজেদের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আড়াল করতে বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। তাঁরা আলু পচনের প্রকৃত কারণ জানার জন্য অধিকতর তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবী করেছেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বর্তমানে ৩৯টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি সচল। এই হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সক্ষমতা বিদ্যমান। তবে এবারের উৎপাদন বেশি হওয়ায় অনেক হিমাগারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করতে হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে রাজনৈতিক নেতাদের চাপেও কিছু হিমাগার অতিরিক্ত আলু নিতে বাধ্য হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাস-সিএনজির সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নিহত, আহত ৪
রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ এলাকায় অবস্থিত তামান্না স্পেশাল কোল্ড স্টোরেজ থেকে প্রতিদিন গাড়ি ভর্তি করে পচা আলু বের করা হচ্ছে। ওই হিমাগারে আলু রেখেছিলেন ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু গ্রহণ করা হয়েছিল। এখন লোডশেডিংয়ের কারণে আলু ঘেমে পচে যাচ্ছে। ফলে পচে যাওয়া আলু ফেলে দিতে হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে আলু পচছে—এমন ধারণা তাঁরা করেন না। বরং হিমাগার মালিকদের অব্যবস্থাপনা এবং মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণের কারণে আলু নষ্ট হচ্ছে।
সংগঠনটির সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম ডনি মূল সমস্যা হিসেবে ওভারলোডিংকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, একটি হিমাগারে বছরে ২৫ থেকে ৩০ বার আলুর অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়। এ সময় আলু বের করে বাতাস দেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু অতিরিক্ত আলু রাখার কারণে বহু হিমাগার এবার নিয়মিতভাবে এ কাজ করতে পারছে না। ফলে আলু নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, রাজশাহীর আলাই বিদিরপুরের রহমান ব্রাদার্স-১ কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন হলেও সেখানে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার টন আলু রাখা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, জেলার প্রায় সব হিমাগারেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: কেন্দুয়ায় পাচারের সময় ৩২ বস্তা সার জব্দ, চালক পালিয়েছে
কিন্তু রাজশাহী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ফজলুর রহমান এসব অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ। তিনি বলেছেন, মৌসুমের শুরুতে চাপের কারণে কিছু হিমাগারকে অতিরিক্ত আলু নিতে হয়েছিল। তবে তিনি মনে করেন, হিমাগার ব্যবস্থাপনায় বড় কোন সমস্যা হচ্ছে না এবং এই কারণে আলু পচছে—এমন ধারণা তাঁরা করেন না।
লোডশেডিংয়ের কারণে হিমাগার মালিকদের ব্যয় বেড়েছে জানিয়ে ফজলুর রহমান বলেছেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরও ১ থেকে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত হিমাগার ঠাণ্ডা থাকে। তবে এর বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। এক ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়ে যায়। প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, হিমাগারগুলোকে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ২৮ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। জেনারেটরের খরচ যোগ হওয়ার কারণে মালিকদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই তিনি হিমাগারগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রমেন্দ্র চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, গত বুধবার থেকে লোডশেডিং কমে গেছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি ভালো আছে। হিমাগারে সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে কেউ তাঁকে ফোন করেননি। তিনি মন্তব্য করেছেন, কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও হিমাগারগুলোতে বড় ধরণের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
লক্ষ্যণীয় হলো, আলু পচনের প্রকৃত কারণ নিয়ে চাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে ক্ষতির মুখে পড়ছেন মূলত আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে পচনের কারণ নির্ধারণ করা এবং দায়ী পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন