১০:৪৬ এম
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ স্টোরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার দুই সপ্তাহ পরেও এখনও অপারেশন থিয়েটার ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। অক্সিজেন লাইনের ক্ষতি এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকির কারণে বর্তমানে জরুরি ও নির্বাচিত সব ধরনের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। এর ফলস্বরূপ, অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা শতাধিক রোগী চরম অনিশ্চয়তা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন।
এই ঘটনার সম্পর্কে জানা যায়, গত ২০ মে ভোরে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারসংলগ্ন স্টোর রুমে আগুন লেগে যায়। এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর পরপরই পুরো অপারেশন থিয়েটার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ঘটনার দিনই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত সংস্কার এবং পুনরায় চালুর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে, দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও সেই নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়নে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
সাতক্ষীরার রেশমা আক্তার ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচারের জন্য দেড় মাস ধরে অপেক্ষায় আছেন। গত সপ্তাহে তার অপারেশনের কথা থাকলেও অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হয়নি। অন্তঃসত্ত্বা এই নারীর অবস্থা দিনে দিনে আরও সংকটাপূর্ণ হয়ে উঠছে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার না হলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের কারণে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরের ভর্তি নিয়ে যেতে পারছেন না।
আরও পড়ুন: ইনানীতে ৪২ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে আগুন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি
রেশমার স্বামী সিরাজুল ইসলাম বলেন, 'ডাক্তাররা দ্রুত অপারেশনের কথা বলেছিলেন। এখন তারা বলছেন, আপাতত অপারেশন হচ্ছে না। এখন আমরা কি করবো? বুঝে উঠতে পারছি না।'
এদিকে, রেশমা আক্তারই একমাত্র নন, সার্জারি, নিউরো সার্জারি, ইউরোলজি, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের শত শত রোগীর অস্ত্রোপচার আটকে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্রোপচারের কথা থাকলেও আগুনের কারণে সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। নতুন রোগীদেরও ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম ভোগান্তি এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সময় কাটাচ্ছেন।
নড়াইলের রোগীর স্বজন কামাল হোসেন বলেন, 'অপারেশনের তারিখ ঠিক ছিল, সব কিছু প্রস্তুত ছিল। হঠাৎ আগুনে সব বন্ধ হয়ে গেল। এখন কবে হবে, কেউ বলতে পারছে না।'
খুলনার আরেক স্বজন লতিফা বেগম বলেন, 'আমার ভাইয়ের মাথায় সমস্যা। অপারেশন জরুরি। কিন্তু তা করা যাচ্ছে না।'
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার, নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ
বিপত্তি সবদিক থেকে চিকিৎসকরাও পড়েছেন। তাদের মতে, সময়মতো অস্ত্রোপচার না হওয়ার কারণে অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। তারা কর্তৃপক্ষকে বারবার দ্রুত অপারেশন থিয়েটার চালুর জন্য অনুরোধ করছেন।
নিউরো সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রিয়াজ আহমেদ বলেন, 'যাদের জরুরি অপারেশন দরকার, তাদের অনেকের অবস্থাই খারাপের দিকে যাচ্ছে। থিয়েটার বন্ধ থাকায় চিকিৎসা দিতে পারছি না।'
অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. দিলীপ কুমার কুণ্ডু বলেন, 'অপারেশন বন্ধ থাকার কারণে রোগীদের জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে মৃত্যুঝকির সৃষ্টি হচ্ছে। দ্রুত থিয়েটার চালু না হলে সংকট আরও বাড়বে।'
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রীর নির্দেশনা থাকার পরও গণপূর্ত বিভাগ এখনও ক্ষয়ক্ষতির নিরূপণ শেষ করতে পারেনি। তাই সংস্কার কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেছেন, 'স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু গণপূর্ত বিভাগের অ্যাসেসমেন্ট এখনও শেষ হয়নি। তাই কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। প্রশাসনিক এবং কারিগরি জটিলতার কারণে প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হচ্ছে।'
অন্যদিকে, গণপূর্ত বিভাগের খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিম জানিয়েছেন, 'ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম ও অবকাঠামো পুরোপুরি অপসারণ না হওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা দ্রুত মেরামতের কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি। আশা করছি, আগামী ২০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।'
সব মিলিয়ে একটি ছোট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো হাসপাতালের অস্ত্রোপচার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন রোগীর চাপ, চিকিৎসা অনিশ্চয়তা এবং মানবিক সংকট বাড়ছে। দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: মাগুরায় বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় সাবেক ওসি ও এসআইকে কারাগারে পাঠাল আদালত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন