০৮:৪২ পি.এম
মহান সুযোগ থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে দেশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলগুলি পরিকল্পনার বাইরে থাকছে। এই ৩৬ লাখ একর চরভূমিতে কৃষি, মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদ খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের অর্থনীতিতে যোগ করা সম্ভব হতে পারে। এজন্য সচেতন নাগরিকরা জনপ্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চর উন্নয়ন বোর্ড বা কর্তৃপক্ষ গঠনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনাতে চরাঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তারা এ বিষয়ে উল্লেখ করেন, চর উন্নয়ন বোর্ড বা কর্তৃপক্ষ গঠন করা উচিত পার্বত্য ও হাওড়াঞ্চলের মতো, যা সময়ের দাবি হয়ে উঠছে।
চারপাশে থৈ থৈ পানি রয়েছে এবং মাঝখানে জেগে থাকা বালুচরগুলো এমন, যেখানে বর্ষার সময় বন্যার জলে ভাসতে হয়। গ্রীষ্মের সময় খরার সঙ্গে লড়াই করতে হয় এবং ভাঙনের কারণে সব কিছু হারানোর কষ্ট সহ্য করতে হয় চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের। ইউপি সদস্য মহির উদ্দিন বলেন, চরাঞ্চলের বাসিন্দারা খরা, বন্যা এবং নদীভাঙনের সঙ্গে সবসময় লড়াই করেন।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
গাইবান্ধার দুর্গম গুপ্তমণি চরের এই দৃশ্য কেবল এখানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের ৩২টি জেলায় ১০০টি উপজেলার চরাঞ্চলেও এটি দেখা যায়। এখানে প্রায় ১৫ লাখ পরিবারে ৬০ লাখ মানুষ বসবাস করছে। নদীভাঙনের কারণে সর্বহারা হওয়া এই মানুষগুলোর টিকে থাকার সংগ্রাম চিরন্তন। যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল এবং শিক্ষায় তারা পিছিয়ে রয়েছে। চিকিৎসার অভাবও তাদের দুশ্চিন্তার একটি বড় কারণ। মানসম্মত শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের অভাবে চরাঞ্চলের মানুষ বারবার পিছিয়ে পড়ছে।
তবে এই চরাঞ্চলগুলিতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পল্লী উন্নয়ন একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩৬ লাখ একর চরভূমির মধ্যে প্রায় ১০ লাখ একর জমি চাষের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। মাত্র ভুট্টা চাষের মাধ্যমে ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং মরিচ, পাট, বাদাম ও অন্যান্য ফসল চাষ করে চরাঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ফসল পাওয়া সম্ভব। এখানে প্রচুর চারণভূমি রয়েছে এবং প্রায় সব পরিবারে ৪ থেকে ৫টি গবাদিপশু রয়েছে। চরবাসীরা দিনরাত শ্রম দিয়ে উর্বর পলি মাটিতে সোনা রাঙা ফসল ফলিয়ে থাকে।
অর্থনীতিবিদ ও ক্ষেত্রবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি চরাঞ্চলের বিপুল কৃষি, মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদ খাতকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে দেশের অর্থনীতির চেহারা সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট ‘মাস্টারপ্ল্যান’ এবং ‘চর উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করা। এটি করা হলে চরাঞ্চলের মানুষের দরিদ্রতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে দাবি করেন বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি-আরডিএ’র চর ডেভলপমেন্ট রিসার্স সেন্টারের উপ পরিচালক কৃষিবিদ মোজাহারুল হক।
তিনি আরো বলেন, বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল মূল পরিকল্পনার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে প্রায় ৬০ লাখ চরবাসী পিছিয়ে পড়ছে। চরম অবহেলা এবং লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার এসব মানুষ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
সাংস্কৃতিক কর্মী মানিক বাহার বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই চরের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী বা কার্যকর কোনো মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেনি।’
প্রবীণ সাংস্কৃতিককর্মী ও রাজনীতিক শাজাহান খান আবু মন্তব্য করেন, অতীতে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলেও, বর্তমানে তার কার্যকারিতা নেই। কেউই চরাঞ্চলের দিকে নজর দিচ্ছেন না। চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, উৎপাদিত কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা, এবং তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রশাসক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক বলেন, পার্বত্য এবং হাওড়াঞ্চলের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কিন্তু চরাঞ্চলের জন্য কোনো কিছুই নেই। তাই চরাঞ্চলকে উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনার জন্য সরকারের উচিত চর উন্নয়ন বোর্ড বা কর্তৃপক্ষ গঠন করা। তা হলেই চরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ থেকে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা সম্ভব।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ২৪.৩ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, কিন্তু চরাঞ্চলের অতি-দারিদ্র্যের হার ১২.৯ শতাংশে রয়েছে। গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা জানিয়েছেন, সরকার চরাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য কিছু নতুন পরিকল্পনা গঠন করেছে।
আরও পড়ুন: নিম্নতম মজুরি বোর্ড অচিরেই গঠন হবে: শ্রমমন্ত্রী
তিনি বলেন, সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা উঠে এসেছে, যেখানে চরাঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশেষ করে প্রাণিসম্পদ এবং মৎস্য খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে। অন্যদিকে গাইবান্ধা সদর-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিম আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' চূড়ান্ত বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চলের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
সচেতন নাগরিকরা মন্তব্য করেন, তিস্তা বা ব্রহ্মপুত্রের চরগুলোকে অভিশাপের পরিবর্তে আশীর্বাদে রূপান্তরিত করার জন্য সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এর মাধ্যমে চরাঞ্চলকে দেশের একটি প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করা যাবে। ৬০ লাখ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন এবং টেকসই বাংলাদেশ গড়তে চরাঞ্চলকে মূলধারার পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন