০৯:১৪ পি.এম
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেছেন, "ব্যাংক ডাকাতের গাড়িতে চড়ে সংসদে যাওয়া সরকার জনগণের নয়। তারা নিজেদের অনেক কিছু দিতে পারলেও জনগণকে কিছু দিতে পারবে না। পেছনের তিন মাসে তার প্রমাণিত হয়েছে। আগে শোনা যেতো সবাই খারাপ, শুধু শেখ হাসিনা ভালো। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে সবাই খারাপ, শুধু প্রধানমন্ত্রী ভালো। মূলত ফ্যাসিস্ট আমলের দেখিয়ে দেওয়া পথেই এই সরকার হাঁটছে। তারা জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারবে না।"
শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদূর্ভোগ লাঘব ও দ্রব্য মূল নিয়ন্ত্রণের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে শনিবার দুপুর ১২টা থেকেই চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাগপা, এলডিপিসহ ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা লালদিঘির ময়দানে আসতে থাকেন। বিকেল তিনটার আগেই সমাস্থল কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সমাবেশে নেতাকর্মীরা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে সরকারকে আহ্বান জানিয়ে নানারকম প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। সমাবেশকে ঘিরে লালদিঘি ও আশেপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
আরও পড়ুন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের সঙ্গে উইনরক ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ
এসময় জামায়াত আমীর সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, "আপনারা যদি ভালো করেন আমরা প্রশংসা করব। কিন্তু ভুল করলে বা খারাপ করলে অবশ্যই সমালোচনা করব। আপনাদের সময় খুবই সীমিত। এই সীমিত সময়ে যদি পরিবর্তন হয়ে যান তাহলে আপনাদের অভিনন্দন জানাব। আর না হলে আপনাদের বিদায়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এই চট্টগ্রাম থেকেই সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।"
কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমীর বলেন, "তিনি বলেছেন, মদ, সিগারেটের দাম বাড়ায় বিরোধী দল বাজেটকে স্বাগত না জানিয়ে সমালোচনা করছে। মূলত মদের দাম বাড়ায় নয়, তেল, গ্যাস ও নিত্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করছি। প্রয়োজনে রাজপথেও নামব। তিনি যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ ভুয়া।"
জামায়াত আমীর আরও বলেন, "গণভোটের গণরায় সরকারকে অবশ্যই মানতে হবে। সরকার সংসদে বলেন, তাদেরকে জনগণকে ৫১ শতাংশ ভোটে জনগণ ক্ষমতায় পাঠিয়েছে। তারা ৫১ শতাংশ দেখলেও তার চেয়ে বেশি ৭০ শতাংশ মানুষের গণভোটের গণরায় বুঝেন না, দেখেনও না। তাদেরকে কিভাবে দেখাতে হয় সেটি জনগণ জানে। যেভাবে ৯৬ সালে তত্ববধায়ক সরকারের দাবি মানতে জনগণ তাদের বাধ্য করেছিল, প্রয়োজনে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আবারও সেভাবেই বাধ্য করা হবে। জুলাইয়ের সঙ্গে কোন আপোষ হবে না।"
জাতীয় সংসদে স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, "অনেক বিষয়ে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে যদি বাক স্বাধীনতা হরণ করা হয় তাহলে আমরা জনতার সংসদে ফিরে আসতে বাধ্য হব।"
আরও পড়ুন: হাসপাতালে সাংবাদিক এনাম সরকারের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিলেন রিজভী
তিনি বলেন, "৭০ ভাগ মানুষ রায় দিয়েছে মানতে হবে সরকারকে। যেই সরকার জনগণের রায় মানে তারা জনগণের সরকার হতে পারে না। জনগণের রায় না মানলে জনগণ বসে বসে আঙ্গুল চুষবে না।" জামায়াত আমীর বলেন, "আমরা চেয়েছি জনগণের সব সমস্যার সমাধান সংসদে হোক। কিন্তু সরকার চায়নি। সরকার আমাদেরকে রাজপথে ঠেলে দিয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডে আমরা বাধ্য হয়েছি রাজপথে নেমে আসতে। এখানে আর কোন স্পিকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে না।"
এসময় তিনি সীমান্তের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, "একটা স্বাধীন সার্বভৌম সংসদে কি হচ্ছে আপনারা জানেন। দেশের সীমান্ত নিয়ে নোটিশ দিয়েছিলাম। সেই নোটিশ নিয়ে তালবাহানা করা হচ্ছে। বয় কিসের? কাকে ভয় পান? কাকে খুশি করতে চান? যদি জনগণের সরকার হয়ে থাকেন আমাদেরকে সংসদে আলোচনা করতে সুযোগ দিন। আমরা সংসদে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য আলোচনা করতে চায় না, আমরা আলোচনা করতে চায় দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করতে।"
সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে এলডিপি’র চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ, বীর বিক্রম প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন, "যারা আপনার পাশে রয়েছে তারা আপনাকে ভুল বুঝাচ্ছেন। অন্যদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ইঁদুর আপনার ঘরে। দিল্লির দাসরা আপনারা ঘরে। দালালেরা আপনার ঘরে। আগে ঘর সামলান। তারপর অন্যকে দোষ দেন। এভাবে সবাইকে শত্রু করে আপনি বেশি দিন টিকতে পারবেন না। তাই সময় থাকতে বলছি, আপনি বিরোধী দলকে বন্ধু বানান। তাহলে হয়তো টিকতে পারবেন। কারণ বিরোধী দল সংস্কার চায়, তাদের নিজেদের লাভ চায় না। বিরোধী দল চায় এদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হোক, সিস্টেমের পরিবর্তন চায়।"
ভারতের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের দড়ি ছেড়া গরু সুবেন্দুকে না সামলালে ভারতের অবস্থা বেগতিক হবে।"
আরও পড়ুন: বিএনপির সারাদেশে র্যালির ঘোষণা ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে
সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, "এই সরকার বাংলাদেশের কোন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পারবে না। কারণ তারা জনগণের রায়কে শুরুতেই উপেক্ষা করেছে। আজ দেখুন চট্টগ্রামে বাংলাদেশের পুলিশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন সদস্যকে তুলে নিয়ে অপহরণ করে। সংস্কার না করার কুফল আরও দেখতে পাবে জনগণ।"
তিনি বলেন, "সরকার যদি সংস্কার না করে তাহলে জনগণ আবারও গণঅভ্যুত্থানের পথে হাঁটবে। ইতিমধ্যে সরকারের নতজানু নীতির কারণে সীমান্তে আবারও হত্যা শুরু হয়েছে। জনগণ একদিকে, সরকার আরেক দিকে। সীমান্তে জনগণ বিজিবিকে সহায়তা করছে, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্ত হত্যাকে বৈধতা দিচ্ছে। দুর্নীতি, বৈষম্যের দিকে গেলে সরকারকে খুব বেশি সময় দেওয়া হবে না। এখুনি সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে আসুন।"
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের আমীর আল্লামা মামুনুল হক বলেন, "জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও জনমতের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ না করে জনগণের দাবি মেনে নেওয়াই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সঠিক পথ।"
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, "নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি টিকে থাকতে পারবে না। জাতীয় স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।"
আরও পড়ুন: মরক্কো-সিঙ্গাপুরসহ ৪ দেশের রাষ্ট্রদূত আনসার একাডেমী পরিদর্শন
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী বলেছেন, "পার্লামেন্ট থেকে সচিবালয়—সব জায়গায় হুতুমপেঁচা বসেছে। তারা সেখানে দুর্নীতি ও অনিয়মসহ সব ধরনের অপকর্ম করছে। সরকারের ঘোষিত এটি কোন বাজেট নয়, এটি মূলত বিএনপি নেতাকর্মীদের পকেট ভারী করার গেজেট। যেই বাজেটে বাংলাদেশের বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই সেটি কোন বাজেট নয়।"
সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন