০২:২৭ এম
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির এক মাস হওয়ারও কম সময়ের মধ্যে, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় প্রায় দেড় দশক ধরে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের দলে ভাঙনের চিহ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ভোটের পরে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ তুলে নবনির্বাচিত দুই বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী এবং সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করার পর, দলের একটি অংশ ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছে বলে জানা যাচ্ছে। খবর বিবিসি বাংলার।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন যে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠেছে তার একটি নমুনা হতে পারে গত রবিবারের ঘটনা, যখন মমতা ব্যানার্জী নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককে এক বৈঠকে ডেকেছিলেন, কিন্তু সেখানে মাত্র কুড়ি জন হাজির ছিলেন।
আরও পড়ুন: সাগর-রুনি হত্যায় ট্রাইব্যুনালের তথ্য যাচাই করছে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স
এই অবস্থায় দলের অন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বলতে শোনা গেছে যে তৃণমূল ‘কার্যত উঠে যাওয়া একটা পার্টি।’ অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মমতা ব্যানার্জী দাবি করেছেন যে তৃণমূলকে ভাঙা কখনোই সম্ভব নয়।
এরপরেই সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দেন যে বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগটা বিধানসভার স্পিকারের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসেরই দুই বিধায়কের—ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা—কাছে জানানো হয়েছিল।
এছাড়া দলটির অনেক নেতা, মুখপাত্র, বিধায়কও ভোটে হারের পর থেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন: জাপান-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব জোরদারের প্রতিশ্রুতি দুই প্রধানমন্ত্রীর
ঋতব্রত ব্যানার্জীও সেইসব নেতাদের মধ্যে ছিলেন। এর মধ্যেই দিল্লি সফরে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত এই বিধায়ক ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সামান্য কথাও হয়। তবে এতে জল্পনা চলছিল যে তিনি বিজেপিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন কিনা।
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন সিপি(আই)এম দল থেকে বহিষ্কৃত এই নেতা। বিজেপিও জানিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস বা অন্যদল থেকে কাউকে নেওয়া হবে না।
তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়ে কথিত ‘বিদ্রোহীদের’ নেতৃত্বে থাকা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহার পরিকল্পনায় দলের ফাটল ‘চওড়া’ হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন অনেকেই।
যদি নির্বাচিত বিধায়কদের সিংহভাগের ‘সমর্থন’ তারা পান, তাহলে এদের মধ্য থেকেই কেউ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ দাবি করতে পারেন।
আরও পড়ুন: শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিতে শাহবাগে মানববন্ধন
বিজেপির তাপস রায় এই প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতো অবস্থা হয়েছে তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকার এর কাছে প্রায় ৫০ জন টিএমসির বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গেছে ঋতব্রত।
মঙ্গলবার বিধানসভায় প্রবেশের আগে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমাকে তৃণমূল বহিষ্কার করতে পারে, কিন্তু তাতে মমতা ব্যানার্জীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা এতটুকুও কমে যায় না। তিনি আমাদের সকলের নেত্রী।”
তবে তাপস রায়ের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি আর সন্দীপন যৌথভাবে স্পিকারকে বিষয়টা জানিয়েছেন। আমি আমার আর সন্দীপনের দায় নিতে পারব, তবে কোনো জল্পনাকে ইন্ধন দেওয়ার মতো কোনো উপাদান আমার কাছে নেই।”
সই সংক্রান্ত অসংগতির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে হলে দিতে হবে কয়েকদিন পিছনে যেতে।
আরও পড়ুন: সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির বার্ষিক কমিউনিটি ডিনার অনুষ্ঠিত
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কে বিরোধী দলনেতা হবেন, তা ঠিক করতে গত ছয়ই মে মমতা ব্যানার্জীর বাড়িতে বিধায়কদের একটি বৈঠক হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার কথা।
বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর নিয়ম মেনে সই করেন সমস্ত বিধায়কেরা। স্পিকারের তরফে বিরোধী দল হিসাবে তৃণমূলের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার নাম নিয়ে প্রস্তাবনা পত্র চাওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯শে মে আবার কালীঘাটে বৈঠক ডাকেন মমতা ব্যানার্জী। কিন্তু ওই দিন অনেকে অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ। উপস্থিত সকলের সই নেওয়া হয় দলের পক্ষ থেকে। সমস্যা শুরু হয়ে ওই প্রস্তাবনাকে ঘিরেই। বিধায়কদের সইতে অসংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূল পাল্টা অভিযোগ তোলে যে এর নেপথ্যে রয়েছে বিজেপি।
সোমবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দেন যে বিজেপি নয়, তৃণমূলের টিকিটে বিধানসভা ভোটে জিতে আসা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকারের কাছে ওই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: রয়েছে সব আয়োজন, তবুও অচল ঝিনাইদহের ৪ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র
তারপরেই তৃণমূল কংগ্রেস ওই দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করে। তাদের বিরুদ্ধে ‘দল বিরোধী কার্যকলাপের’ অভিযোগ তোলে।
এদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়কদের স্বাক্ষরে অসংগতির অভিযোগ ওঠার পর কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। পরে মুখ্যমন্ত্রী মামলার তদন্তের ভার রাজ্য পুলিশের সিআইডিকে দেন।
সংশ্লিষ্ট নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ তুলেছেন, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপ-দলনেতা এবং মুখ্য সচেতকের নাম প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের যে স্বাক্ষর রয়েছে তার মধ্যে বেশ কয়েকটি ইংরেজির ব্লক লেটারে রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন তদন্তের সময় বিধায়কদের অনেকে জানিয়েছেন, তারা নাকি ওই প্রস্তাবনায় সই-ই করেননি।
এ বিষয়ে অভিষেক ব্যানার্জীকে তলব করেছিল সিআইডি। সোমবার ‘শারীরিক অসুস্থতার’ কারণ দেখিয়ে হাজিরা দেননি অভিষেক ব্যানার্জী।
আরও পড়ুন: এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ, দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জাতিসংঘের
সইয়ে অসংগতির অভিযোগ ও তৃণমূলের তরফে বহিষ্কার প্রসঙ্গে ঋতব্রত ব্যানার্জী বলেছেন, “বিধায়ক বা সাংসদ হিসাবে কেউ যখন শপথ গ্রহণ করেন, তখন তিনি সংবিধানের নামে শপথ নেন। ভয় বা পক্ষপাতের উর্দ্ধে উঠে তারা কাজ করেন। যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি।”
তিনি বলেন, “দলের বৈঠকে যখন আমরা দ্বিতীয়বার যাই, তখন বলা হয়েছিল ১৯ মে তারিখে মিটিং, কিন্তু আপনারা সই করার সময় তারিখ ছয়ই মে লিখুন। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, এতদিন কেন বলেননি। আসলে অত সাহস ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, “আমার আগে অনেকে সই করেছিলেন, আমি দেখলাম এমন অনেকের সই রয়েছে যারা বৈঠকেই আসেননি।”
তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত আরেক বিধায়ক সন্দীপন সাহা বার্তাসংস্থা এএনআইকে বলেছেন, “দলে নৈতিক কথাবার্তা বললেই দলবিরোধী কার্যকলাপের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়, কারণ দল নিজেই নৈতিক আচরণ করে না।” তবে দলের পদক্ষেপ নিয়ে তার ‘আক্ষেপ নেই’ বলেই জানিয়েছেন তিনি।
তার কথায়, “যদি নৈতিক কাজের জন্য দল থেকে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে আমি খুশি। কারণ নৈতিক কাজ করাই আইনপ্রণেতাদের দায়িত্ব এবং আমরা ঠিক সেটাই করেছি।”
এই দুই বিধায়কের পদক্ষেপ নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহার উচিত ছিল এই বিষয়ে বিধানসভার স্পিকারের বদলে তৃণমূলকে জানানো।
ঋতব্রত ব্যানার্জীর নাম না করেই মমতা ব্যানার্জী ফেসবুক লাইভ থেকে বলেছেন, “সিপিএম করত। আমাদের ভুল হয়েছে তাকে টিকিট দেওয়া। পায়ে এসে পড়েছিল। সেদিন সিপিএম ঠিক করেছিল।” একদা সিপি(আই)এম’র তরফে রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছিল ঋতব্রত ব্যানার্জীকে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৭ সালে একাধিক অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করে সিপি(আই)এম। পরে তৃণমূলে যোগ দেন এবং চলতি বিধানসভা ভোটে তাকে প্রার্থীও করে তৃণমূল।
সেই প্রসঙ্গ টেনে কটাক্ষ করেছেন মমতা ব্যানার্জী।
দলের দুই অধুনা বহিষ্কৃত বিধায়ক সম্পর্কে কুণাল ঘোষ বলেছেন, “জিতে গেলে, সরকার গড়লে সব ভালো। আর আজ দল ক্ষমতায় নেই বলে সব খারাপ হয়ে গেল? তাহলে দলের টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন কেন?”
তৃণমূল কংগ্রেস বহিষ্কার করার পর, দলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০ থেকে কমে ৭৮তে দাঁড়িয়েছে।
যদি তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কই ধরা যায়, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি অর্থাৎ, অন্তত ৫৩ জন বিধায়ক দলত্যাগ করতে রাজি হন, তাহলে বিরোধী দলনেতার পদের দাবি জানাতে পারেন।
ইতোমধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের একটি বড় অংশ নাকি বেরিয়ে যেতে পারেন। তৃণমূল অবশ্য সেই জল্পনা খারিজ করে দিয়েছে।
কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বলেছেন, “কোনো দলের ভাঙনের ক্ষেত্রে পুশ ও পুল এ দুই ফ্যাক্টর কাজ করে। মমতা ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে ছাড়া এই মুহূর্তে কাউকে বহিষ্কার করেননি। আর পুল ফ্যাক্টর বলতে বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য আগেই জানিয়েছেন, অন্য দল ছেড়ে বেরিয়ে আসা কাউকে তারা নেবেন না। অন্যদিকে কংগ্রেসও তৃণমূলের কাউকে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।”
সম্প্রতি অভিষেক ব্যানার্জীসহ দলের বিভিন্ন নেতাকে ঘিরে যেভাবে বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে, তেমনটাও আগে দেখা যায়নি।
বিবিসি বাংলার সিনিয়র সাংবাদিক শুভজ্যোতি বলেন, “এ দলের সে অর্থে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। দলটি পুরোপুরি নেত্রী মমতা ব্যানার্জী কেন্দ্রিক, তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই দলে শেষ কথা– আর এ কারণেই মমতা নিজে যখন কোণঠাসা, তৃণমূল কংগ্রেসও দল হিসেবে দিশেহারা অবস্থায় পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধুমাত্র মমতা ব্যানার্জীর সাফল্যের কারণেই দলটি এতদূর আসতে পেরেছিল। কিন্তু তাঁর শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর আসন থেকেও মমতার শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের ভাঙন স্পষ্টতই দৃশ্যমান।”
শুভজ্যোতি জানিয়েছেন, “আজকের তারিখেও লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ৪২ জন সংসদ সদস্য, রাজ্য বিধানসভায় ৮০ জন বিধায়ক এবং পশ্চিমবঙ্গে ৪১ শতাংশ ভোট রয়েছে। তবুও, যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তা এক অর্থে মমতা ব্যানার্জীর জন্য। বলা হচ্ছে তিনি অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে যতই অভিযোগ থাক, তা নিয়ে কিছুই করেননি এবং পরিবারের বিষয়ে চোখ বন্ধ রেখেছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন