০৮:০০ পি.এম
ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে একটি শোকযাত্রা এগিয়ে যাচ্ছিল। ভিড়ের মানুষেরা বুক চাপড়াচ্ছিল এবং শোকধ্বনি তুলে একত্রিত হচ্ছিল। তাদের শোকের বিলাপের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল শহরের বাইরের পাহাড়ি এলাকায় চলমান গোলাবর্ষণের মৃদু শব্দ। ‘এটাই কারবালার ট্র্যাজেডি, হায় ইমাম হোসেন, দেখুন। এটাই কারবালার ট্র্যাজেডি,’ দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে আশুরার শোভাযাত্রায় স্লোগানদাতা মানুষের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
আশুরা হচ্ছে ৬৮০ সালে কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসেনের শাহাদাত স্মরণে পালিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এটি এখন শিয়া মুসলিমদের কাছে জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সাধারণ সময়ে নাবাতিয়েহর বার্ষিক এই অনুষ্ঠান শহরের গর্বের বিষয়। প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এতে অংশ নেয় এবং শহরের রাস্তাঘাট তখন শোকের সমবেত ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু এবছর হিজবুল্লাহ-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে কারবালা যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। এই যুদ্ধে লেবাননে ৩,৯০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই শিয়া মুসলিম। নাবাতিয়েহ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে একটি এবং এর অধিকাংশ এলাকায় এখন কার্যত আশ্রয়হীনতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
গত বুধবার (১৭ জুন) শহরের অধিবাসীদের শোকের ধ্বনিগুলো যেন চাপা পড়ে গিয়েছিল মাটির স্তূপ ও ধ্বংসাবশেষের নিচে। ১০০ দিনের যুদ্ধের পরে শহরের রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল এবং ভবনগুলো ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছিল। ২০০ কিংবা তার বেশি মানুষের উপস্থিতি সেই নিস্তব্ধতা ভাঙতে যথেষ্ট ছিল না।
এবারের আশুরায় নাবাতিয়েহ তার সাম্প্রতিক নিহতদের জন্য শোক ও সম্মান প্রদর্শন করছিল। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের চোখের জল স্মরণ করছিল সেই যুদ্ধের কথা, যা এই শহরের অধিকাংশ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং অনেকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, যারা ইসরাইলের অবিরাম বিমান হামলার সময় পালানোর সুযোগ লাভেরও সম্ভাবনা পাননি।
শহরের রাস্তায় শহীদদের পোস্টার প্রদর্শিত ছিল। পাশের হারূফ গ্রামের প্রবেশমুখের গোলচত্বরে ৩ মিটার উচ্চতার একটি পোস্টারে শুধুমাত্র ওই গ্রামের নিহত ৫০ জন তরুণ হিজবুল্লাহ যোদ্ধার ছবি স্থান পেয়েছিল। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ৫০ বছর বয়সি ইসমাইল ইয়াঘি বলেছেন, ‘এ বছরের আশুরার অর্থ আমাদের জন্য বিশেষ। এই যুদ্ধের পুরো তিন মাস আমরা প্রতিদিন কারবালার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।’
কথা বলতে বলতে তিনি নিহত তরুণদের ছবির দিকে তাকালেন, যেগুলো মসজিদের দেয়ালে টাঙানো ছিল এবং অংশগ্রহণকারীদের টি-শার্ট ও ব্যাজে দেখা যাচ্ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের হৃদয়ে যেমন দুঃখ রয়েছে, আবার আমাদের শহীদদের জন্য গর্বও রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, কেউ মারা গেলে তার জীবন শেষ হয়ে যায় না। বরং তার অনন্ত জীবন তখনই শুরু হয়।’
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখেই বাসিন্দারা ভাবতেই পারেননি যে, তারা এ বছর নাবাতিয়েহতে আশুরা পালন করতে পারবেন। ইসরাইলি বোমাবর্ষণ এবং শহর ত্যাগের নির্দেশে প্রায় ৮০ হাজার বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। গত সোমবার (১৫ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত সমঝোতা স্মারক অপ্রত্যাশিতভাবে লেবাননের যুদ্ধ থামিয়ে দেয় এবং নাবাতিয়েহ পুরোপুরি দখল করার দ্বারপ্রান্তে থাকা ইসরাইলি বাহিনীর অগ্রযাত্রাও থেমে যায়।
এরপর সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা দ্রুত আশুরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। নাবাতিয়েহ অ্যাম্বুলেন্স সেবার স্বেচ্ছাসেবকরা চিকিৎসা সরঞ্জাম নামিয়ে রেখে ঝাড়ু হাতে নেন। তারা শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে থাকে এবং বিমান হামলার ফলে সৃষ্ট দেয়ালের বড় গর্তগুলো ঢাকতে কালো ব্যানার টাঙাতে থাকে।
অ্যাম্বুলেন্স সেবার প্রধান ৪৫ বছর বয়সি মেহদি সাদেক বলেন, ‘সাধারনত আশুরার প্রস্তুতিতে পুরো এক মাস সময় লাগে। কিন্তু এবার আমাদের হাতে ছিল মাত্র দুই দিন।’ কথা বলতে বলতে তিনি পেঁয়াজ ও মসলা ভর্তি একটি বড় পাত্র নাড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ ইসরাইলি গোলাবর্ষণের শব্দে ভবন কেঁপে উঠলে তিনি বাইরে তাকান। নাবাতিয়েহ ঘিরে থাকা পাহাড়ের ওপর ধোঁয়ার কুণ্ডলী তখন দেখা যাচ্ছিল।
যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’-এ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। ইসরাইলি সেনারা শহরের প্রান্তের আলি তাহের পাহাড়ের ঠিক ওপারেই অবস্থান করে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
গতরাতে সংঘর্ষের তীব্রতা আরও বাড়ে। হিজবুল্লাহর হামলায় চারেরও বেশি ইসরাইলি সেনা নিহত হন। তাদের জবাবে ইসরাইল নাবাতিয়েহ এবং আশপাশে বিমান হামলা চালায়, যা ১৮ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত করে। সাদেক বলেন, ‘গতকাল এখানে অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু রাতটা ছিল কঠিন। প্রচুর গোলাবর্ষণ হয়েছে।’
ইসরাইল মঙ্গলবার (১৬ জুন) ফিরে আসা বাসিন্দাদের ওপর গুলি চালানোর পর লেবাননের সেনাবাহিনী শহরের উঁচু অংশ ও ইসরাইলি অবস্থানের কাছে গ্রামগুলোতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। অনেক পরিবার আবারও সহিংসতার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
সাদেক বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম পরিস্থিতি আরও ভালো হবে। আমরা একটি প্রকৃত যুদ্ধবিরতির প্রত্যাশা করেছিলাম। মানুষকে ফিরে আসার কারণ তৈরি করতেই আমরা নাবাতিয়েহতে আশুরা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তবুও, খুব বেশি সংখ্যক মানুষ শহর ও আশপাশের গ্রামগুলোতে ফিরে আসেননি। কেউ কেউ শুধুমাত্র নিজেদের বাড়িঘর দেখতে এসেছিলেন এবং দ্রুত চলে গেছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির পর যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ফিরে এসে তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট পুনর্নির্মাণ শুরু করেছিলেন, এবার সেই জাতিগত পরিস্থিতি যেন অদৃশ্য।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
যুদ্ধে বৈরুতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া ৩৩ বছর বয়সি প্রকৌশলী হুসেইন নাহলে জানান, তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও তিনি আশুরায় অংশ নিতে নাবাতিয়েহতে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে তিনি শহরের এমন কিছু মানুষের বাড়িতে অবস্থান করছেন, যাদের ঘর এখনও অক্ষত রয়েছে।
তার পাশেই দাঁড়িয়ে কয়েকজন আকাশের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। দূরে আকাশের উপর একটি ইসরাইলি ড্রোন চক্কর দিচ্ছিল এবং শোক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ করছিল।
শোকযাত্রা চলার সময় সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ করছিলেন। যুদ্ধের সময় যেসব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল না, সেখানকার বিমান হামলার স্থানগুলো চিহ্নিত করে রাখার কাজ চলছিল।
যুদ্ধবিরতির সুযোগে তারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ খুঁজছিলেন। তবে সব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার শহরের দক্ষিণে আগুন নেভাতে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের কাছাকাছি এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী গোলাবর্ষণ করেছিল।
আরও পড়ুন: ‘নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি আস্থার অভাব’, বুথফেরত জরিপে মন্তব্য আইজেনকোটের
নাবাতিয়েহ অঞ্চলের সিভিল ডিফেন্স প্রধান হুসেইন ফাকিহ বলেন, ‘নাবাতিয়েহতে পরিস্থিতি আগের মতোই আছে, বরং অবস্থা আরও কঠিন হয়েছে। আসলেই যুদ্ধবিরতি আছে কি না সেটি পরিষ্কার নয়।’
সাক্ষাৎকারের মাঝখানে তিনি একটি ফোনকল পান। ফিরে এসে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার মেয়ে মাত্র জানিয়েছে, ইসরাইলিদের হামলায় আমাদের বাড়িটিও ধ্বংস হয়ে গেছে।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন