০৯:৩৯ এম
পাকিস্তানের ব্রড পিকে ভয়াবহ তুষারধসে নিখোঁজ হওয়ার ১০ দিনেরও বেশি সময় পর দেশে ফিরেছে তিন নেপালি পর্বতারোহী ও গাইডের মরদেহ। মঙ্গলবার তাদের মরদেহ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে পৌঁছায়।
নিহত পর্বতারোহীদের মধ্যে ছিলেন কিলি পেম্বা শেরপা, গ্যালু শেরপা ও নিমা শেরপা। এরা ছিলেন নেপালের অভিজ্ঞ এবং পরিচিত পর্বতারোহী এবং উচ্চপর্যায়ের গাইড। মঙ্গলবার কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছিল। দোহা থেকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে তিনজনের কফিন কাঠমান্ডু পৌঁছায়।
বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা কফিনগুলো বিমান থেকে নামিয়ে শববাহী গাড়িতে তুলেছিলেন। এ সময় বিমানবন্দরে নিহতদের পরিবারের সদস্য, সহপর্বতারোহী, নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং অভিযানের আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও সেখানে ছিলেন। কফিন বিমানবন্দর থেকে বের করার সময় স্বজনদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
আরও পড়ুন: বেনজির-নওয়াজের মতো ইমরান খানকে দেশ ছাড়ায় বাধ্য করার অভিযোগ
গত ৩০ জুলাই সকালে পাকিস্তানের ৮ হাজার ৫১ মিটার উঁচু ব্রড পিকে ভয়াবহ তুষারধসের ঘটনা ঘটে। সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাম্পের মাঝামাঝি প্রায় ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় এ ঘটনা ঘটে। এই তুষারধসে তখন একটি আন্তর্জাতিক দলের ১০ জন পর্বতারোহী নিহত হন। ব্রড পিক পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত এবং এটি বিশ্বের ১২তম সর্বোচ্চ পর্বত। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ-নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজা, যিনি নিমসদাই নামেও পরিচিত।
এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে ছিলেন নেপালের পুর বাহাদুর গুরুঙ, নাওয়াং থিন্দু শেরপা, ওমানের পর্বতারোহী নাধিরা আল হারথি, চীনের ওয়াং ঝং, পাকিস্তানের গাইড সোহেল সাখি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর্বতারোহী ম্যালরি গেইস।
নিহত কিলি পেম্বা শেরপা ‘কিলু’ নামেও পরিচিত ছিলেন। ৪৬ বছর বয়সী এই পর্বতারোহীর বাড়ি নেপালের দোলখা জেলার রোলওয়ালিং উপত্যকায়। তিনি হিমালয়ে পর্বতারোহণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কে-টুতে শীতকালীন প্রথম সফল আরোহণের ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার বিশ্বের ১৪টি পর্বত জয় করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। গত ৩ জুলাই নাঙ্গা পর্বত জয় করার মধ্য দিয়ে তিনি এই মাইলফলকে পৌঁছান। কিলি পেম্বা নেপালের পর্বতারোহণ প্রতিষ্ঠান ইমাজিন নেপালের গাইড হিসেবে কাজ করতেন। গ্যালু শেরপা গ্যালজেন নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি নেপালের ওখলঢুঙ্গা জেলার বাসিন্দা ছিলেন এবং সেভেন সামিট ট্রেকসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটি মৌসুমে তিনি তিনবার কাঞ্চনজঙ্ঘা জয় করেছিলেন, যা পর্বতারোহণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অসাধারণ কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন। তিনি একাধিকবার এভারেস্টেও আরোহণ করেছিলেন।
নিহত আরেক পর্বতারোহী নিমা শেরপা ছিলেন নেপালের সংখুভাসভা জেলার বাসিন্দা। তিনিও ত্রিশের কোঠার মাঝামাঝি বয়সী ছিলেন এবং এলিট এক্সপেডের জ্যেষ্ঠ গাইড হিসেবে কাজ করতেন। ২০২৬ সালের ব্রড পিক অভিযানে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার চারটি পর্বত জয় করেছিলেন। ব্রড পিকে নিহত নেপালের পাঁচ পর্বতারোহীর মধ্যে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে পুর বাহাদুর গুরুঙের মরদেহ নেপালে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। ব্রিটিশ-নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজার মরদেহ যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তার নাগরিকত্ব ছিল। তবে এখনো পর্বতে থাকা আরো তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তাদের মধ্যে একজন নেপালি, একজন পাকিস্তানি এবং একজন মার্কিন নাগরিক। দুর্গম এলাকা ও অনেক বেশি উচ্চতার কারণে উদ্ধারের কাজটি কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: লালন সাঁইয়ের দর্শনে মানবতা ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ার আহ্বান : খাদ্যমন্ত্রী
ব্রড পিক পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে পাকিস্তান-চীন সীমান্তের কাছে অবস্থিত এবং এটি ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার একটি কঠিন পর্বত হিসেবে পরিচিত। কাছের কে-টু পর্বতের তুলনায় ব্রড পিকে সাধারণত পর্বতারোহীর সংখ্যা কম হলেও, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাম্পের মাঝামাঝি খোলা ওপরের অংশে এর আগেও তুষারধসের ঘটনা ঘটেছে। পর্বতারোহীদের ভাষ্য মতে, কারাকোরাম অঞ্চলে তুষারের স্তরের অবস্থায় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে এবং কিছু পর্বতারোহী ও গবেষক এর সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তিত ধরনকে যুক্ত করছেন। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে পর্বতের পথে তুষারের অবস্থা আগের তুলনায় বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গত ৩০ জুলাইয়ের তুষারধসে একই দলের ১০ সদস্য নিহত হন। অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের মতে, ব্রড পিকের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক দুর্ঘটনাগুলোর একটি। নেপালের উচ্চপর্বতে কর্মরত পর্বতারোহী ও গাইডদের জন্যও এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি। এর আগে ২০১৪ সালে এভারেস্টে ভয়াবহ বরফধস এবং ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে তুষারধসে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ব্রড পিকের এবারের দুর্ঘটনা আবারও বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বতগুলোতে তুষারধস ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন