বৃহস্পতিবার, ২৩শে জুলাই, ২০২৬ ইং
১২:১৮ এম
নোয়াখালীতে বাসি খাবার সংরক্ষণ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের অভিযোগে দুই বিরিয়ানি হাউজকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এই জরিমানা করেছে। বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে নোয়াখালী সদর উপজেলার টাউনহল মোড় ও দত্তেরহাট এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের সময় জেলা শহরের টাউন হল মোড়ের মেসার্স হাজী বিরিয়ানি হাউজে বাসি খিচুড়ি, তেহারি, বিরিয়ানি এবং সিদ্ধ ডিম পলিথিনে ভরে ফ্রিজে সংরক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং সংরক্ষণ করা বাসি খাবার জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।
অন্যদিকে, দত্তেরহাট এলাকার মেসার্স টোকিও কাচ্চি বাড়িতে কাচ্চিতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ কেওড়া জল এবং খাবার রঙিন করতে ‘কাশ্মীরি চিলি’ নামে রং ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। এছাড়া ফ্রিজে রান্না করা ও কাঁচা খাবার একসঙ্গে সংরক্ষণ করা হচ্ছিল।
এসব অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে আরো ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করা হয়।
এ ছাড়া অভিযানে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি হচ্ছে কি না, তা মনিটরিং করা হয়। অভিযানে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ করা হয়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আছাদুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে জেলা বিশেষ টাস্কফোর্স টিম ও জেলা ব্যাটালিয়ন আনসারের একটি দল অংশ নেয়।
জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
চাঁদপুরে ঘটেছে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যেখানে ট্রাফিক পুলিশের পোশাক ও পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। শেষ পর্যন্ত সিএনজি ও অটোরিকশা চালকদের সচেতনতার কারণে আটক হয়েছে এক ভুয়া ট্রাফিক পুলিশ। আটককৃত ব্যক্তির নাম সুমন গাজী, যিনি হাজীগঞ্জ উপজেলায় বাস করেন। জানা গেছে, তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই চাঁদপুরের পালবাজার এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ পরিচয়ে সিএনজি ও অটোরিকশা থামিয়ে চালকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে আসছিলেন। ঘটনার দিন, মঙ্গলবার, তিনি প্রথমে নিজেকে ট্রাফিক পুলিশের সদস্য পরিচয় দেন। এরপর তিনি নিরাপদ সড়কের সদস্য বলেও দাবি করেন। কিন্তু চালকদের সন্দেহ হলে তারা তাকে আটক করে, এবং পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়ে ডোপ টেস্ট করলে তার মাদক সেবনে নিহিত প্রমাণ মেলে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি অসহায় মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে পাওয়া টাকায় মাদক সেবন করতেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পরে আদালতে পাঠানোর পর আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, কেউ যদি পুলিশের পরিচয় দিয়ে অবৈধভাবে টাকা দাবি করে, তাহলে তার পরিচয় নিশ্চিত করে দ্রুত পুলিশকে জানানো উচিত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শীর্ষ শিক্ষাব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ককরোচ আন্দোলন বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই আন্দোলন গত মাসের শুরুর দিকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিলো। তবে এখন এটি শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং সরকারের জবাবদিহির প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বিস্তৃত হয়ে গেছে। এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশাসনকে নতুন করে নড়েচড়ে বসতে হয়েছে।
জেন-জিদের এই বিশাল বিক্ষোভ মোদি সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্দোলনকারীরা এবার সরাসরি মোদি সরকারের জবাবদিহি চাইছেন। প্রথম দিকে মাত্র একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ছিল তাদের ক্ষোভ, কিন্তু এখন তারা পূর্ণ শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় চাপাতে শুরু করেছেন।
বিক্ষোভকারীরা জানাচ্ছেন, শুধু মন্ত্রী বদলে কিছু হবে না, তারা পুরো সরকারের জবাবদিহি দাবি করছেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই আন্দোলন পূর্ববর্তী অনেক বিক্ষোভ থেকে ভিন্ন এবং এটি সরকারের উপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। আগের আন্দোলনগুলোতে সরকার ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মাধ্যমে বিক্ষোভকে বিভক্ত করতে পারলেও, এবারের আন্দোলন বাস্তব সমস্যার ভিত্তিতে গঠিত। কর্মসংস্থান, পরীক্ষা, শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কেন্দ্রিক এই আন্দোলনকে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর আন্দোলন হিসাবে দেখা হচ্ছে না।
এই আন্দোলন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চললেও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রতিনিধি এখনও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেননি। শিক্ষার্থীরা বারবার প্রশ্ন করছেন, প্রশ্ন ফাঁসের দায় কার, কী সংস্কার হবে, কেন কেউ দায় স্বীকার করছেন না—এগুলো জানতে চাইছেন।
আন্দোলনের ৩২তম দিনে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, উভয় পক্ষের অবস্থান এখনও কঠোর হয়ে রয়েছে। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আলোচনা শুরু করতে হলে প্রথম উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকেই নিতে হবে।
অন্যদিকে বিরোধী জোটও সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধের অভিযোগ তুলে চাপ বাড়িয়ে চলেছে সংসদ ও রাজপথে। বুধবার সকালে যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে।
যাবতীয় ঘটনার মধ্যে বুধবার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন, ‘গতকাল (মঙ্গলবার) যখন তাকে আটক করা হয় তখন পুলিশের একজন সদস্য কানে কানে বলেন, এই (মোদি) সরকারের পতন ঘটাও।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
হোমনা উপজেলা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে কুমিল্লার হোমনা উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি, নজরুল গবেষক ও রামচন্দ্রপুর অধ্যাপক আব্দুল মজিদ কলেজের অধ্যাপক শাহ আলমের স্মরণে অনুষ্ঠিত হয় সভা ও দোয়া মাহফিল। এই আয়োজনটি প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বিকেল চারটায় অনুষ্ঠিত হয়।
স্মরণসভায় বক্তারা মন্তব্য করেন, অধ্যাপক শাহ আলম ছিলেন একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও বিনয়ী সাংবাদিক। তিনি একজন কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার এবং নিবেদিতপ্রাণ নজরুল গবেষক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার কর্মজীবনে তিনি দেশপ্রিয় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে, যেমন- আজকের কাগজ, বাংলার বাণী, আমাদের সময়, আমাদের অর্থনীতি, আমাদের নতুন সময় এবং দেশ রূপান্তর, সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সভাটি সভাপতিত্ব করেন প্রেসক্লাবের সভাপতি মোর্শেদুল ইসলাম শাজু। হোমনা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আক্তার হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন হোমনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবদুল হক সরকার, উপজেলা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ক্রাইম পেট্রোল টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিল, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক কবি দেলোয়ার, উপজেলা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মোরশিদ আলম এবং প্রচার সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি মো. আবুল বাসার সরকার, মো. হানিফ খান ও মো. মকবুল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক মইনুল ইসলাম মিশুক, সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন, শফিকুল ইসলাম মুন্না, মো. হারুন অর রশিদ, রুহুল আমিন জুয়েল, তপন সরকার, মো. রাসেল আহম্মেদ এবং আবু রায়হান চৌধুরিসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা। সভার শেষে মরহুম অধ্যাপক শাহ আলম, নজরুল ইসলাম সরকার ও আবদুল বাতেনের জন্য মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন হোমনা উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন হাফেজ মাওলানা আবদুল কুদ্দুস।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বেলুচিস্তানের রুক্ষ, ধূসর পাহাড়শ্রেণির পটভূমিতে যখন একটি ভিডিওতে প্রথম দেখা যায় সামরিক পোশাক পরিহিতা এক নারীকে চারপাশে সারিবদ্ধ সশস্ত্র নারী যোদ্ধা, দৃষ্টিতে দৃঢ়তা, কণ্ঠে অবিচল আত্মবিশ্বাস, তখন সে দৃশ্য নিছক একটি প্রচার-ভিডিও থেকে বেশি কিছু হয়ে ওঠে।
তা হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন, একটি ঘোষণা, এবং একই সঙ্গে একটি ইতিহাসের নতুন পাতার সূচনা। বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) তাকে পরিচয় দিয়েছে সংগঠনের একজন কমান্ডার হিসেবে, যুদ্ধনাম ‘সাদো’ নাম শাইনাজ বালোচ।
ধারণা করা হচ্ছে, দশকের পর দশক ধরে চলা এই সশস্ত্র আন্দোলনে তিনিই প্রথম নারী, যিনি এতটা প্রকাশ্য ও উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের আসনে উপবিষ্ট হয়েছেন।
তার এই আবির্ভাব নিছক আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এটি ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন বেলুচিস্তানে নাগরিক প্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম দুটি ভিন্ন স্রোত ক্রমশ একে অপরের কাছাকাছি এসে মিলিত হচ্ছে।
একদিকে বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি)-র মতো নাগরিক আন্দোলন, যার নেতৃত্বে আছেন মেহরাং বালোচ ও সাম্মি দীন বালোচের মতো নাম, যারা জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও সামরিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা করে চলেছেন বছরের পর বছর ধরে।
অন্যদিকে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছে সশস্ত্র প্রতিরোধ। আর ঠিক এই দুই স্রোতের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন শাইনাজ বালোচ, একজন রাজনৈতিক সচেতন নারী, যিনি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাধারণ কর্মী থেকে সরাসরি এক অস্ত্রধারী কমান্ডারের ভূমিকায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বহু বছর ধরে বেলুচিস্তানের লড়াইকে বাইরের দুনিয়া দেখেছে এক সংকীর্ণ চোখে কখনো গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, কখনো পশ্চাৎপদতা, কখনো-বা বহিঃশক্তির চক্রান্ত হিসেবে। আর নারীদের বেলায় সেই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আরও সংকীর্ণ। তাঁদের কেবল ভুক্তভোগী, কেবল শোকার্ত মা-বোন হিসেবেই চিত্রিত করা হয়েছে বারবার।
শাইনাজ বালোচের আবির্ভাব সেই বহু পুরনো বয়ানকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি নিজেকে কান্নার প্রতিমূর্তি হতে দিতে রাজি নন। বরং নিজেকে তিনি উপস্থাপন করেছেন সংগ্রামের গতিপথ নির্ধারণে সক্রিয় এক কুশীলব হিসেবে।
নিচের এই বিশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো তার সেই বিরল সাক্ষাৎকারের মূল বক্তব্য, এক নারীর ভাবনার জগৎ, যিনি নাগরিক সক্রিয়তা থেকে সশস্ত্র নেতৃত্বে পা রেখেছেন, ঠিক এমন এক মুহূর্তে, যখন বেলুচিস্তানের সংঘাত পৌঁছে গেছে নতুন এক তীব্রতায়।
‘বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি’, নেতৃত্বের দর্শনগত ভিত্তি।
শাইনাজ বালোচ তার নেতৃত্বে ওঠার পথকে কোনো একক ঘটনার ফল বলে মানতে নারাজ। তার ভাষায়, এটি এক দার্শনিক উত্তরণ। হেগেলের বিচ্ছিন্নতা-উত্তরণের (Entfremdung) ধারণার প্রতিধ্বনি, তার যুক্তি। মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তা খুঁজে পায় না নিঃসঙ্গতায়, বরং ইতিহাসের বৃহৎ প্রবাহে নিজেকে স্থাপন করার মধ্য দিয়েই।
দখলদারিত্ব তার কাছে কোনো বাহ্যিক আঘাত নয়, এটি জন্ম থেকেই মানুষের ভেতরে বাস করা এক কাঠামোগত বাস্তবতা। তার কথায়, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে টিকে থাকাটাই এক ধরনের আত্ম-বিচ্ছিন্নতা। আর প্রকৃত চেতনার জন্ম হচ্ছে সেই সত্য উপলব্ধির মুহূর্তে। তাই তার কাছে অস্ত্র হাতে তোলা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিজের ভেতরের সত্তার সঙ্গে চূড়ান্ত পুনর্মিলন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বেলুচিস্তানের মুক্তি সম্ভব নয় যদি জনসংখ্যার অর্ধেক নারীসমাজ কেবল ইতিহাসের দর্শক হয়ে থাকে। নারীরা এই সংগ্রামে আসছে না কোনো আনুষ্ঠানিকতা পূরণে, বরং নিজেদের হারানো ঐতিহাসিক ভূমিকা পুনরুদ্ধারের তাগিদে।
নারীরা কখনোই নীরব দর্শক ছিল না। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গুম, নির্যাতন, প্রতিবাদকারীদের ওপর আক্রমণ তাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথমেই একটি প্রচলিত ধারণা খণ্ডন করেন। তার দাবি, বেলুচ নারীরা কোনোদিনই আন্দোলনের প্রান্তবর্তী চরিত্র ছিলেন না। সশস্ত্র হোক বা নিরস্ত্র উভয় পরিসরেই তারা গঠন করেছেন প্রতিরোধের মূল কাঠামো।
তিনি এমন এক বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করেন, যা নারীর অস্ত্র হাতে তোলাকে সবসময় ব্যক্তিগত শোক বা ট্রমার ফল বলে সরলীকরণ করে। তার ভাষায়, তার সিদ্ধান্ত এসেছে সচেতন, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রত্যয় থেকে, কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে নয়। নাগরিক আন্দোলন যেমন বিওয়াইসি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা প্রকাশ্যে আনে, তেমনি তিনি মনে করেন কেবল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দিয়ে একটি সুসজ্জিত সামরিক কাঠামোর পতন ঘটানো যায় না।
নারী যোদ্ধার উত্থান, তিনটি মাত্রা। মজিদ ব্রিগেডের ফিদায়ী অভিযানে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শাইনাজ তিনটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। প্রথমত, রাজনৈতিক ও কাঠামোগত কারণ। রাষ্ট্র তার ভাষায় প্রতিটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে সশস্ত্র প্রতিরোধ আর ঐচ্ছিক নয়, অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায় হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, তিনি মনে করেন, আন্দোলনের ভেতরেই ঘটেছে এক অভ্যন্তরীণ রূপান্তর। সমাজের সেকেলে, পিতৃতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে বছরগুলো ধরে চলা আন্দোলনের চাপে। যার ফলে নারীকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামার আগেই ঘরের ভেতরে মুক্ত করে দিয়েছে। তৃতীয়ত, তরুণ নারীদের বাড়তে থাকা শিক্ষার হার ও রাজনৈতিক সচেতনতা।
তার মতে, একজন নারী যোদ্ধা একই সঙ্গে দুটি বার্তা বহন করে রাষ্ট্রের প্রতি, যে তার দমননীতি ব্যর্থ হয়েছে; আর নিজের সমাজের প্রতি, যে জাতীয় মুক্তি অসম্পূর্ণ থাকবে লিঙ্গ মুক্তি ছাড়া।
আমাকে সবসময় বলা হয় নারী কমান্ডার। সবচেয়ে ক্ষুরধার এক প্রশ্ন ছিল আত্মঘাতী অভিযানে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে। এটি কি সত্যিকারের সিদ্ধান্ত, নাকি হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া বাধ্যবাধকতা? শাইনাজ এই প্রশ্নকেই একধরনের পক্ষপাত বলে চিহ্নিত করেন। তার যুক্তি, একজন পুরুষ যোদ্ধা যখন উচ্চ ঝুঁকির অভিযানে যোগ দেয়, তাকে দেখা হয় আদর্শবাদী সৈনিক হিসেবে। কিন্তু একজন নারীর একই সিদ্ধান্তে সন্দেহের চোখে খোঁজা হয় বহিরাগত প্রভাব, মানসিক দুর্বলতা কিংবা জবরদস্তি। তার ভাষায়, ‘একজন পুরুষ কমান্ডারকে শুধু কমান্ডার বলা হয়, আমাকে বলা হয় নারী কমান্ডার।’
তিনি দাবি করেন, তাদের সংগঠনে যোদ্ধা নির্বাচন হয় দীর্ঘ আদর্শিক মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে, আবেগ বা প্রতিশোধের তাড়নায় নয়। নাগরিক আন্দোলন বনাম অস্ত্র, প্রতিযোগিতা নয়, ধারাবাহিকতা। বিওয়াইসি-র মতো অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্পর্ক নিয়ে শাইনাজের অবস্থান স্পষ্ট। তিনি এই দুই পথকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই চেতনার দুটি ভিন্ন প্রকাশ বলে বর্ণনা করেন। তবে ফ্রাঁৎস ফানোঁর বরাত দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন ঔপনিবেশিকতা যুক্তির ভাষা বোঝে না। তা কেবল সংগঠিত শক্তির সামনেই নতিস্বীকার করে। নাগরিক মিছিল ও ধরনাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করলেও মনে করেন, রাষ্ট্র এই প্রতিবাদগুলোকে নিয়মিতভাবে উপেক্ষা বা দমন করে চলছে।
বৈধতা, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দবন্ধ এবং ভূরাজনীতি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেলুচ প্রশ্নকে ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর চশমা দিয়ে দেখার প্রবণতা নিয়ে তিনি তীব্র আপত্তি জানান। তার মতে, আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রায়শই বৈশ্বিক শোষণ ও দখলদারিত্বের সহযোগী। তাই তাদের সনদের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তিনি মনে করেন, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি এক রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনগুলোকে অবৈধ প্রতিপন্ন করতে ব্যবহৃত হয়। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক জনমত পরিবর্তনের পথ বৈশ্বিক বিবেকের কাছে আবেদন নয়, বরং কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করা।
আমি কমান্ডার, এইটুকুই যথেষ্ট। সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অংশে শাইনাজ কথা বলেন এক নারী কমান্ডার হিসেবে তার নিজস্ব অবস্থান নিয়ে। তিনি প্রত্যাখ্যান করেন ‘প্রতিনিধিত্বের বোঝা’-র ধারণা। তার ভাষায়, পুরুষ সহযোদ্ধাদের কখনো পরিবারের সম্মিলিত শোকের ভার বহন করতে হয় না। অথচ নারীর কাছে সেই প্রত্যাশা থেকেই যায়। তিনি চান এমন এক বেলুচিস্তান, যেখানে এই বৈষম্যমূলক প্রত্যাশাগুলোর অস্তিত্বই থাকবে না। তার কাছে বিজয়ের অর্থ কেবল একটি নতুন সীমানা বা ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং ন্যায়বিচার, লিঙ্গসাম্য ও সম্পদের যৌথ মালিকানার ওপর দাঁড়ানো এক নতুন সমাজব্যবস্থা। যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয় নির্ধারিত হবে যুদ্ধ বা দারিদ্র্যের ইতিহাস দিয়ে নয়, বরং তাদের নিজস্ব সম্ভাবনা দিয়ে।
সম্পাদকীয় নোট। বেলুচিস্তানের সংঘাত প্রবেশ করেছে এক নতুন, তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ে। এতদিন আন্তর্জাতিক দৃষ্টি মূলত নিবদ্ধ ছিল বিওয়াইসি এবং মেহরাং বালোচ, সাম্মি দীন বালোচের মতো নেতৃত্বের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর। সশস্ত্র বিদ্রোহের ভেতরকার পরিবর্তনগুলো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত থেকে গেছে। শাইনাজ বালোচের প্রকাশ্য আবির্ভাব এই সংঘাতের এক লক্ষণীয় বাঁক নির্দেশ করে।
এই লেখাটি একটি সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক প্রতিবেদনের ভাবানুবাদ ও সাহিত্যিক উপস্থাপনা মাত্র। এখানে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণভাবে সাক্ষাৎকারদাতার নিজের। তা কোনোভাবেই এই লেখার অনুবাদক বা কোনো প্রকাশনার নীতিগত অবস্থান নয়।
একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে বোঝার চেষ্টা তার পদ্ধতিকে সমর্থন করা নয়, বরং তা সাংবাদিকতার এক মৌলিক দায়িত্ব। জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতগুলোকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা। পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, এই বিবরণের পাশাপাশি রাষ্ট্র, স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনও বিবেচনায় নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এই দীর্ঘ ও জটিল সংঘাত সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা গড়ে তোলার জন্য।
অনুবাদ ও উপস্থাপনা: জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান, লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ