প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বেলুচিস্তানের রুক্ষ, ধূসর পাহাড়শ্রেণির পটভূমিতে যখন একটি ভিডিওতে প্রথম দেখা যায় সামরিক পোশাক পরিহিতা এক নারীকে চারপাশে সারিবদ্ধ সশস্ত্র নারী যোদ্ধা, দৃষ্টিতে দৃঢ়তা, কণ্ঠে অবিচল আত্মবিশ্বাস, তখন সে দৃশ্য নিছক একটি প্রচার-ভিডিও থেকে বেশি কিছু হয়ে ওঠে।
তা হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন, একটি ঘোষণা, এবং একই সঙ্গে একটি ইতিহাসের নতুন পাতার সূচনা। বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) তাকে পরিচয় দিয়েছে সংগঠনের একজন কমান্ডার হিসেবে, যুদ্ধনাম ‘সাদো’ নাম শাইনাজ বালোচ।
ধারণা করা হচ্ছে, দশকের পর দশক ধরে চলা এই সশস্ত্র আন্দোলনে তিনিই প্রথম নারী, যিনি এতটা প্রকাশ্য ও উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের আসনে উপবিষ্ট হয়েছেন।
তার এই আবির্ভাব নিছক আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এটি ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন বেলুচিস্তানে নাগরিক প্রতিরোধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম দুটি ভিন্ন স্রোত ক্রমশ একে অপরের কাছাকাছি এসে মিলিত হচ্ছে।
একদিকে বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি)-র মতো নাগরিক আন্দোলন, যার নেতৃত্বে আছেন মেহরাং বালোচ ও সাম্মি দীন বালোচের মতো নাম, যারা জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও সামরিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা করে চলেছেন বছরের পর বছর ধরে।
অন্যদিকে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছে সশস্ত্র প্রতিরোধ। আর ঠিক এই দুই স্রোতের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন শাইনাজ বালোচ, একজন রাজনৈতিক সচেতন নারী, যিনি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাধারণ কর্মী থেকে সরাসরি এক অস্ত্রধারী কমান্ডারের ভূমিকায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বহু বছর ধরে বেলুচিস্তানের লড়াইকে বাইরের দুনিয়া দেখেছে এক সংকীর্ণ চোখে কখনো গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, কখনো পশ্চাৎপদতা, কখনো-বা বহিঃশক্তির চক্রান্ত হিসেবে। আর নারীদের বেলায় সেই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আরও সংকীর্ণ। তাঁদের কেবল ভুক্তভোগী, কেবল শোকার্ত মা-বোন হিসেবেই চিত্রিত করা হয়েছে বারবার।
শাইনাজ বালোচের আবির্ভাব সেই বহু পুরনো বয়ানকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি নিজেকে কান্নার প্রতিমূর্তি হতে দিতে রাজি নন। বরং নিজেকে তিনি উপস্থাপন করেছেন সংগ্রামের গতিপথ নির্ধারণে সক্রিয় এক কুশীলব হিসেবে।
নিচের এই বিশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো তার সেই বিরল সাক্ষাৎকারের মূল বক্তব্য, এক নারীর ভাবনার জগৎ, যিনি নাগরিক সক্রিয়তা থেকে সশস্ত্র নেতৃত্বে পা রেখেছেন, ঠিক এমন এক মুহূর্তে, যখন বেলুচিস্তানের সংঘাত পৌঁছে গেছে নতুন এক তীব্রতায়।
‘বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি’, নেতৃত্বের দর্শনগত ভিত্তি।
শাইনাজ বালোচ তার নেতৃত্বে ওঠার পথকে কোনো একক ঘটনার ফল বলে মানতে নারাজ। তার ভাষায়, এটি এক দার্শনিক উত্তরণ। হেগেলের বিচ্ছিন্নতা-উত্তরণের (Entfremdung) ধারণার প্রতিধ্বনি, তার যুক্তি। মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তা খুঁজে পায় না নিঃসঙ্গতায়, বরং ইতিহাসের বৃহৎ প্রবাহে নিজেকে স্থাপন করার মধ্য দিয়েই।
দখলদারিত্ব তার কাছে কোনো বাহ্যিক আঘাত নয়, এটি জন্ম থেকেই মানুষের ভেতরে বাস করা এক কাঠামোগত বাস্তবতা। তার কথায়, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে টিকে থাকাটাই এক ধরনের আত্ম-বিচ্ছিন্নতা। আর প্রকৃত চেতনার জন্ম হচ্ছে সেই সত্য উপলব্ধির মুহূর্তে। তাই তার কাছে অস্ত্র হাতে তোলা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিজের ভেতরের সত্তার সঙ্গে চূড়ান্ত পুনর্মিলন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বেলুচিস্তানের মুক্তি সম্ভব নয় যদি জনসংখ্যার অর্ধেক নারীসমাজ কেবল ইতিহাসের দর্শক হয়ে থাকে। নারীরা এই সংগ্রামে আসছে না কোনো আনুষ্ঠানিকতা পূরণে, বরং নিজেদের হারানো ঐতিহাসিক ভূমিকা পুনরুদ্ধারের তাগিদে।
নারীরা কখনোই নীরব দর্শক ছিল না। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গুম, নির্যাতন, প্রতিবাদকারীদের ওপর আক্রমণ তাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথমেই একটি প্রচলিত ধারণা খণ্ডন করেন। তার দাবি, বেলুচ নারীরা কোনোদিনই আন্দোলনের প্রান্তবর্তী চরিত্র ছিলেন না। সশস্ত্র হোক বা নিরস্ত্র উভয় পরিসরেই তারা গঠন করেছেন প্রতিরোধের মূল কাঠামো।
তিনি এমন এক বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করেন, যা নারীর অস্ত্র হাতে তোলাকে সবসময় ব্যক্তিগত শোক বা ট্রমার ফল বলে সরলীকরণ করে। তার ভাষায়, তার সিদ্ধান্ত এসেছে সচেতন, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রত্যয় থেকে, কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে নয়। নাগরিক আন্দোলন যেমন বিওয়াইসি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা প্রকাশ্যে আনে, তেমনি তিনি মনে করেন কেবল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দিয়ে একটি সুসজ্জিত সামরিক কাঠামোর পতন ঘটানো যায় না।
নারী যোদ্ধার উত্থান, তিনটি মাত্রা। মজিদ ব্রিগেডের ফিদায়ী অভিযানে নারীর ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শাইনাজ তিনটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। প্রথমত, রাজনৈতিক ও কাঠামোগত কারণ। রাষ্ট্র তার ভাষায় প্রতিটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে সশস্ত্র প্রতিরোধ আর ঐচ্ছিক নয়, অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায় হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, তিনি মনে করেন, আন্দোলনের ভেতরেই ঘটেছে এক অভ্যন্তরীণ রূপান্তর। সমাজের সেকেলে, পিতৃতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে বছরগুলো ধরে চলা আন্দোলনের চাপে। যার ফলে নারীকে যুদ্ধক্ষেত্রে নামার আগেই ঘরের ভেতরে মুক্ত করে দিয়েছে। তৃতীয়ত, তরুণ নারীদের বাড়তে থাকা শিক্ষার হার ও রাজনৈতিক সচেতনতা।
তার মতে, একজন নারী যোদ্ধা একই সঙ্গে দুটি বার্তা বহন করে রাষ্ট্রের প্রতি, যে তার দমননীতি ব্যর্থ হয়েছে; আর নিজের সমাজের প্রতি, যে জাতীয় মুক্তি অসম্পূর্ণ থাকবে লিঙ্গ মুক্তি ছাড়া।
আমাকে সবসময় বলা হয় নারী কমান্ডার। সবচেয়ে ক্ষুরধার এক প্রশ্ন ছিল আত্মঘাতী অভিযানে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে। এটি কি সত্যিকারের সিদ্ধান্ত, নাকি হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া বাধ্যবাধকতা? শাইনাজ এই প্রশ্নকেই একধরনের পক্ষপাত বলে চিহ্নিত করেন। তার যুক্তি, একজন পুরুষ যোদ্ধা যখন উচ্চ ঝুঁকির অভিযানে যোগ দেয়, তাকে দেখা হয় আদর্শবাদী সৈনিক হিসেবে। কিন্তু একজন নারীর একই সিদ্ধান্তে সন্দেহের চোখে খোঁজা হয় বহিরাগত প্রভাব, মানসিক দুর্বলতা কিংবা জবরদস্তি। তার ভাষায়, ‘একজন পুরুষ কমান্ডারকে শুধু কমান্ডার বলা হয়, আমাকে বলা হয় নারী কমান্ডার।’
তিনি দাবি করেন, তাদের সংগঠনে যোদ্ধা নির্বাচন হয় দীর্ঘ আদর্শিক মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে, আবেগ বা প্রতিশোধের তাড়নায় নয়। নাগরিক আন্দোলন বনাম অস্ত্র, প্রতিযোগিতা নয়, ধারাবাহিকতা। বিওয়াইসি-র মতো অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্পর্ক নিয়ে শাইনাজের অবস্থান স্পষ্ট। তিনি এই দুই পথকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই চেতনার দুটি ভিন্ন প্রকাশ বলে বর্ণনা করেন। তবে ফ্রাঁৎস ফানোঁর বরাত দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন ঔপনিবেশিকতা যুক্তির ভাষা বোঝে না। তা কেবল সংগঠিত শক্তির সামনেই নতিস্বীকার করে। নাগরিক মিছিল ও ধরনাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করলেও মনে করেন, রাষ্ট্র এই প্রতিবাদগুলোকে নিয়মিতভাবে উপেক্ষা বা দমন করে চলছে।
বৈধতা, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দবন্ধ এবং ভূরাজনীতি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেলুচ প্রশ্নকে ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর চশমা দিয়ে দেখার প্রবণতা নিয়ে তিনি তীব্র আপত্তি জানান। তার মতে, আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রায়শই বৈশ্বিক শোষণ ও দখলদারিত্বের সহযোগী। তাই তাদের সনদের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তিনি মনে করেন, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি এক রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনগুলোকে অবৈধ প্রতিপন্ন করতে ব্যবহৃত হয়। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক জনমত পরিবর্তনের পথ বৈশ্বিক বিবেকের কাছে আবেদন নয়, বরং কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করা।
আমি কমান্ডার, এইটুকুই যথেষ্ট। সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অংশে শাইনাজ কথা বলেন এক নারী কমান্ডার হিসেবে তার নিজস্ব অবস্থান নিয়ে। তিনি প্রত্যাখ্যান করেন ‘প্রতিনিধিত্বের বোঝা’-র ধারণা। তার ভাষায়, পুরুষ সহযোদ্ধাদের কখনো পরিবারের সম্মিলিত শোকের ভার বহন করতে হয় না। অথচ নারীর কাছে সেই প্রত্যাশা থেকেই যায়। তিনি চান এমন এক বেলুচিস্তান, যেখানে এই বৈষম্যমূলক প্রত্যাশাগুলোর অস্তিত্বই থাকবে না। তার কাছে বিজয়ের অর্থ কেবল একটি নতুন সীমানা বা ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং ন্যায়বিচার, লিঙ্গসাম্য ও সম্পদের যৌথ মালিকানার ওপর দাঁড়ানো এক নতুন সমাজব্যবস্থা। যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিচয় নির্ধারিত হবে যুদ্ধ বা দারিদ্র্যের ইতিহাস দিয়ে নয়, বরং তাদের নিজস্ব সম্ভাবনা দিয়ে।
সম্পাদকীয় নোট। বেলুচিস্তানের সংঘাত প্রবেশ করেছে এক নতুন, তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ে। এতদিন আন্তর্জাতিক দৃষ্টি মূলত নিবদ্ধ ছিল বিওয়াইসি এবং মেহরাং বালোচ, সাম্মি দীন বালোচের মতো নেতৃত্বের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর। সশস্ত্র বিদ্রোহের ভেতরকার পরিবর্তনগুলো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত থেকে গেছে। শাইনাজ বালোচের প্রকাশ্য আবির্ভাব এই সংঘাতের এক লক্ষণীয় বাঁক নির্দেশ করে।
এই লেখাটি একটি সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক প্রতিবেদনের ভাবানুবাদ ও সাহিত্যিক উপস্থাপনা মাত্র। এখানে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণভাবে সাক্ষাৎকারদাতার নিজের। তা কোনোভাবেই এই লেখার অনুবাদক বা কোনো প্রকাশনার নীতিগত অবস্থান নয়।
একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে বোঝার চেষ্টা তার পদ্ধতিকে সমর্থন করা নয়, বরং তা সাংবাদিকতার এক মৌলিক দায়িত্ব। জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতগুলোকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা। পাঠকদের প্রতি অনুরোধ, এই বিবরণের পাশাপাশি রাষ্ট্র, স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনও বিবেচনায় নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার এই দীর্ঘ ও জটিল সংঘাত সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা গড়ে তোলার জন্য।
অনুবাদ ও উপস্থাপনা: জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান, লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন