০৭:০০ পি.এম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে দেশটিকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো যথেষ্ট নৌ-শক্তি নেই, এমন অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন ইউরোপে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষ জেনারেল। চলমান সপ্তাহে ওই শীর্ষ জেনারেল গোপনে পেন্টাগনকে এই অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের(ডব্লিউপি) প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, যা চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর সৃষ্ট চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ইউএস ইউরোপিয়ান কমান্ডের(ইউকম) প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেউইচ পেন্টাগনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে, নৌবাহিনীর আরেকটি ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) না পেলে তিনি ইসরায়েলের সুরক্ষার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হলে।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, গ্রিনকেউইচের এই বার্তা ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদের অতীতের সতর্কবার্তার মতো, যেখানে তারা ওয়াশিংটনের মনোযোগ প্রয়োজন এমন ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন। ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে, সীমিত সম্পদ ও অস্ত্রের জন্য কমান্ডারদের মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: ২ বছরের বেতনবৃদ্ধি স্থগিত, ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৭টি প্রমাণিত
এখন বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ? ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাতের এক নাজুক পরিস্থিতিতে এই সতর্কবার্তাটি প্রকাশিত হল। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই হামলা শুরু হয়েছে এবং এই অভিযানের তীব্রতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুদ কমে আসছে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত হয়েছে যে, নৌবাহিনীর ওপর বিশেষ চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তেহরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার প্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি বন্দরের ওপর অবরোধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছে। এই অচলাবস্থার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও অন্যান্য পণ্যের চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যমতে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-ডেস্ট্রয়ারগুলো(যুদ্ধজাহাজ) বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলের সুরক্ষায় ভূমিকা পালন করে আসছে। তারা রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরান এবং তেহরানের সহায়তাপ্রাপ্ত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলগুলোকে মাঝপথেই ধ্বংস (ইন্টারসেপ্ট) করে।
ইউরোপিয়ান কমান্ড ভূমধ্যসাগরের এই কার্যক্রমগুলোর সমন্বয় করে থাকে। একইসঙ্গে, ন্যাটোর আওতাধীন অঞ্চলে রাশিয়ার যেকোনো অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুত থাকতে হয়। বিশেষ করে রাশিয়ার নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
আরও পড়ুন: রিজভী: গ্যারান্টি ক্লজের অভাবে তিস্তার পানি পায়নি বাংলাদেশ
নৌবহর সংক্রান্ত যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা নিয়ে পেন্টাগন কর্মকর্তাদের মত, মার্কিন নৌবাহিনী স্পেনের রোটা থেকে পাঁচটি ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন রেখেছে। চলতি বছরের শেষে ষষ্ঠ একটি জাহাজ সেখানে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ‘দ্য পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট কর্মব্যস্ততার ফলে রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা আপাতত জমে উঠেছে, যা গ্রিনকেউইচের জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
পত্রিকাটি এও জানায় যে, নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সামরিক কর্মকর্তাদের অনুরোধে তারা জাহাজের প্রাপ্যতা বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘দ্য পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুর দিকে পেন্টাগনের করা এক মূল্যায়নে দেখা যায়, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ইসরায়েলকে রক্ষার মূল দায়িত্ব মার্কিন বাহিনী পালন করেছে।
ইসরায়েলের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় মার্কিন অস্ত্র যার মধ্যে রয়েছে ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ ব্যবস্থা এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে উৎক্ষেপিত নৌ-ভিত্তিক ইন্টারসেপ্টরের ব্যবহারের পরিমাণ অনেক বেশি।
‘দ্য পোস্ট'-এর উদ্ধৃত একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, শুক্রবার(১ আগস্ট) পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে দুটি ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস পল ইগনাটিয়াস’ এবং ‘ইউএসএস রুজভেল্ট’ অবস্থান করছিল। এছাড়া আরও তিনটি ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস আর্লি বার্ক’, ‘ইউএসএস বাল্কলি’ এবং ‘ইউএসএস অস্কার অস্টিন’ রোটা-তে মোতায়েন ছিল।
আরও পড়ুন: ঝালকাঠিতে মা ইলিশ সংরক্ষণে ৭৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল জব্দ
ইরানের আরও কাছাকাছি আরব সাগরে একটি নৌবহর মোতায়েন রয়েছে বলে সূত্রটি ‘দ্য পোস্ট’-কে জানিয়েছেন। এই বাহিনীতে দুটি বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ড-ব্লিউ বুশ এবং ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং অন্তত ১৫টি অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ১১টি হলো ডেস্ট্রয়ার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন প্রশাসনের অবরোধ আরোপ এবং ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামক একটি উদ্যোগের বাস্তবায়নে এই নৌবহরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর লক্ষ্য হচ্ছে বিতর্কিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর সুরক্ষায় সহায়তা করা।
‘দ্য পোস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগরে ‘ইউএসএস গঞ্জালেজ’ নামে আরেকটি ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন রয়েছে। ওই এলাকায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের ওপর নিজেরা অবরোধ আরোপের চেষ্টা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি আরব সেখানে অবাধ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সামরিক জোট গঠন করেছে।
মার্কিন জনগণের কাছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ক্রমশই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে; একইসঙ্গে কংগ্রেসের উভয় দলের সদস্যরা হতাশা প্রকাশ করছেন। কারণ প্রশাসনের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে সংঘাত অবসানের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সামনে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: পল্টন হত্যাকাণ্ড মামলার নথি গায়েবের অভিযোগ জামায়াতের
‘দ্য পোস্ট’ জানিয়েছে, বিশেষ করে অনেক রিপাবলিকানের মধ্যে জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের দাম যুদ্ধের কারণে বাড়ানোর প্রভাবের উদ্বেগ সৃষ্টি করছে যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের জন্য ক্ষতির কারণ ঘটাতে পারে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেছেন, এই সতর্কবার্তাটি পেন্টাগনের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোর ব্যাপকতাকেই তুলে ধরে।
কারাকো আরও বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যে থাকার কারণে সামরিক প্রস্তুতি ও গোলাবারুদ মজুদ উভয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে। তিনি আরো যোগ করেন, এখন প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে কৌশলটা কী?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন