০৪:৩০ পি.এম
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের প্রত্যাশা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করছেন। এ সফরের ফলে সরকার এবং ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষত, বাণিজ্য, অবকাঠামো, শিল্পায়ন, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গতিশীল করার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্ক ইতিমধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন ও উৎপাদন খাতে গভীরভাবে জড়িত। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে চীনা অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে গতি দিয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রধান আমদানিকারক দেশ। যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, শিল্প কাঁচামাল ও টেক্সটাইল ইনপুটের অမျহবর অংশই দেশে আসে।
রোববার (২১ জুন) দু'দিনের মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী চীনে পৌঁছেছেন। এটি তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। মালয়েশিয়া সফর শেষে তিনি কুয়ালালামপুর থেকে চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে যাবেন।
আরও পড়ুন: জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রতিবাদ: নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তার গ্রেপ্তার
এর আগে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গত শনিবার জানিয়েছেন, সফরে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে।
আসাদ আলম আরও জানান, সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি, কর্মপরিকল্পনা ও প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরের শুরুতে দালিয়ানে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সামার দাভোস সম্মেলনে অংশ নেবেন। সেখানে তিনি 'ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ' শীর্ষক অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতা দেবেন। এরপর তিনি ডব্লিউইএফ প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পরে তিনি বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি, এক্সিম ব্যাংকসহ বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সংস্থার সঙ্গে বৈঠকে অংশগ্রহণ করবেন।
আরও পড়ুন: চীনে পরিবারের দায়িত্বে শিশুদের চেয়ে বয়স্কদের প্রতি বেশি মনোযোগ
আগামী ২৫ জুন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম'-এ প্রধান বক্তা হিসেবে দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে এ বাণিজ্যের কাঠামো প্রধানত আমদানি নির্ভর হওয়ায় বাংলাদেশের রফতানি অংশ তুলনামূলকভাবে কম।
তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন।
বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে চীন বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই) কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও জিডিআই এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিবদ্ধ কাঠামো নয় বরং একটি বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ: জেন-জি আন্দোলনের মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক যুব আন্দোলনে প্রভাব
ব্যবসায়ীদের মতে, এ উদ্যোগগুলোর আওতায় প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, চীনের বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদন শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস, হালকা প্রকৌশল ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান ও রফতানি আয় উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
তার মতে, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৃষিখাতে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ দেখালেও কাঙ্খিত মাত্রায় বিনিয়োগ আসেনি।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা
মোহা. খোরশেদ আলম আরও বলেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চীনের দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বাংলাদেশে কাজে লাগানো গেলে পুঁজিবাজার আরও গভীর ও স্থিতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিল্প সহযোগিতা বাড়লে উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ টানতে হলে সুস্পष्ट নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। চীনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশি টাকা ও চীনা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। তার মতে, এতে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং লেনদেনের ব্যয় হ্রাস পাবে।
চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি সিসিইসিসির দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক ইউসেফ জানান, চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। তার মতে, এ উচ্চপর্যায়ের সফর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন: চীনে পাচারের চেষ্টা, ১২ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী উদ্ধার
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম'-এ চীনা ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করবেন এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেবেন।
ব্যবসায়ীদের মতে, আগামী দিনে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতি নির্ভর করবে তিনটি মূল বিষয়ের ওপর বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর। এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি ঘটলে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। সূত্র বাসস
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন