০৯:৩৪ এম
সীমান্তে অস্বস্তির ঘটনা ঘটছে, বিশেষ করে পুশইন বাড়ার আশঙ্কার কারণে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত থেকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ অথবা ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা নিয়ে বাংলায় কথা বলা অনেক মানুষের কাছে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা, অর্থাৎ পুশইন, বেড়ে যেতে পারে। বিশেষত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে আশঙ্কা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।
ভারতের পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে চার শতাধিক মানুষের জড়ো হওয়ার খবরও এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সরকারি বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভারত থেকে আটক হওয়া ব্যক্তিদের সীমান্ত অঞ্চলে নিয়ে এসে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আটকে রেখে মানসিক চাপ সৃষ্টি করার কাজও হতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা ও কলারোয়া সীমান্তের কাকডাঙ্গা, কেড়াগাছি, তলুইগাছা, বৈকারী, মাদরা ও চন্দনপুর অঞ্চলে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা সম্ভব।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
এদিকে, বিজিবি সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বিজিবির উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’ তিনি জানান, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং আধুনিক প্রযুক্তি, এমনকি ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের কোনো সম্ভাবনা তৈরি করা হবে না।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ঢাকায় সরকার পরিবর্তনের পর পুশইনের বিষয়টি সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে আলোচনা করছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, সীমান্তে পুশইন বন্ধ করার জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলছে। সরকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে, নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এ আলোচনা আরও জোরালো হবে বলেও তিনি জানান।
ভারত থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, জাতীয় পরিচয় যাচাইয়ের জন্য অবৈধভাবে অবস্থানরত দুই হাজার ৬৮০ জন ব্যক্তির তালিকা বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সরকার দ্রুত পরিচয় নিশ্চিত করলে তাদের ফেরত পাঠানো হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্তে বর্তমানে প্রায় ১১০ ‘বাংলাদেশিকে’ একটি শেল্টার হোমে রাখা হয়েছে। ২৭ মে পর্যন্ত নতুন করে আরও ৭০ জনসহ ১৮০ ব্যক্তিকে বিএসএফের হেফাজতে রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
বিজিবির সূত্রে জানা গেছে যে, সীমান্তবর্তী এলাকায় শক্তিশালী টর্চলাইট ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে বিজিবি সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। সীমান্ত পর্যবেক্ষকদের মতে, পুশইন প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী দালালচক্রও জড়িত। তারা আটক হওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, জাল পরিচয়পত্র তৈরি ও অবৈধ সীমান্ত পারাপারের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। আটক হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করার চেষ্টা করা হয়। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
পুশইনের বিষয়টি নতুন নয়। বিজেপি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন হওয়ার পর জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) তৈরি করে এবং বাংলায় কথা বলা মুসলিম নাগরিকদের পরিচয় প্রমাণের ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত আরোপ করার পর থেকে এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ বেড়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এটি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং নাগরিকের পরিচয়, মানবাধিকার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ও এই পুশইন। তারা বলেন, আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক ও বিতর্কিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। হোল্ডিং সেন্টারে দীর্ঘ ‘বন্দিজীবন’ এড়াতে অনেকেই একসময় নিজেদের ‘বাংলাদেশি’ বলে স্বীকার করতে বাধ্য হতে পারেন।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ভাঙার জন্য বিএসএফের অপচেষ্টা উদ্বেগজনক। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী আগে বলেছেন, ১৯৫০ সালের একটি আইন ব্যবহার করে গত কয়েক মাসে প্রায় ২ হাজার জনকে বাংলাদেশের দিকে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে।
সীমান্তভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সপ্রাণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত থেকে ২ হাজার ৪৩৬ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার অভিযোগ রয়েছে, যা মে ও জুন মাসে ছিল ২ হাজার ২০ জন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। সংস্থাটির মতে, পুশইন ও পুশব্যাকের মতো ঘটনা শুধুমাত্র মানবিক সংকট তৈরি করে না, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান বলেন, সীমান্তজুড়ে বিজিবির জনবল বৃদ্ধি করে টহল জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হচ্ছে। বিএসএফকে পুশইনের মতো কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান। সীমান্তবর্তী মানুষকে সতর্ক করতে মাইকিং করা হচ্ছে যাতে তারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা না করে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন