০২:৫১ এম
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত ডোভাল, ভারতের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছেমতো যা খুশি তা করা নয়। তরুণসমাজের মধ্যে অনেক সময় এই স্বাধীনতার ভুল ব্যাখ্যা গ্রহণ করার প্রবণতা দেখা যায়।
শনিবার (১ আগস্ট) পুনেতে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে, ভারতে ইতিহাস ও রাষ্ট্রগঠনে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের চিন্তাভাবনা ও দূরদর্শিতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য দেশের তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য প্রদান করেন।
এদিন পুনেতে আয়োজিত ‘লোকমান্য তিলক জাতীয় পুরস্কার ২০২৬’ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এই বক্তব্য তুলে ধরেন অজিত ডোভাল, যেখানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে উপস্থিত থেকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকাঠামো সুসংহত করতে অবদান রাখার জন্য এনএসএ ডোভালের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।
আরও পড়ুন: আবারও সাংবাদিকের ওপর খেপলেন ট্রাম্প, নেপথ্যে স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় আধুনিক ভারতের তরুণদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অতীতের সঙ্গে তুলনা টেনে তাঁরা স্বাধীনতার মহিমা ও তা অর্জনের কষ্টকর পথের স্মৃতি নতুন করে মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, আজকের প্রজন্ম যে স্বাধীনতা ভোগ করছে, তা মোটেই লোকমান্য তিলকের যুগের কঠিন পরিস্থিতির চেয়ে ভিন্ন। সেই সময়ের সংকটময় পরিবেশ, যন্ত্রণা ও সংগ্রাম আজকের তরুণদের পক্ষে কল্পনা করাও দুরূহ।
তিনি উল্লেখ করেন, লোকমান্য তিলকের জীবন, তার চরিত্রের গভীরতা বুঝতে হলে তৎকালীন সময়ের সংকটময় প্রেক্ষাপট, সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতা ও অত্যন্ত শোচনীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন, যা আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে কিছুটা কঠিন। তাই প্রত্যেক ভারতবাসীর, বিশেষ করে যুবসমাজের উচিত, তিলকের বাণী, ভারতের জন্য তার দেখা স্বপ্ন এবং রাষ্ট্রগঠনে তার আত্মত্যাগের চেতনাকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করা এবং সেগুলোর পুনর্বিবেচনা করা।
আজকের তরুণদের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডোভাল বলেছেন, বর্তমান প্রজন্ম সম্ভবত মনে করতে পারে ভারত শুরু থেকেই উন্নত ও স্বাধীন ছিল, বা স্বাধীনতার অর্থ কেবল নিজের ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো কাজ করার অধিকার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার সংজ্ঞা মোটেই তা নয়।
পুনেতে অজিত ডোভালের এই বক্তব্যটি এমন এক প্রেক্ষাপটে এসেছে, যখন সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে তরুণসমাজ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আন্দোলন দেখা যায়। সম্প্রতি নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ‘জেন-জি’ বা নতুন প্রজন্মের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণদের বিশাল গণজমায়েত ও বিক্ষোভ হয়।
আরও পড়ুন: ফুটপাত পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ, ছাত্রলীগ নেতা তানভীর গ্রেফতার
জাতীয় পর্যায়রের নিয়োগ ও প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়ম বিশেষ করে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে। এই নজিরবিহীন আন্দোলনের ফলে কেন্দ্রীয় সরকার চরম রাজনৈতিক চাপে পড়েছিল, যার পরিণামে দেশের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। আন্দোলনের সময় হাজার হাজার শিক্ষার্থী জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা করে, যেখানে পুলিশের লাঠিচার্জের সম্মুখীন হয়েও তাঁরা প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রশাসনের জবাবদিহিতার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে।
একদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি তুলছেন যে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হলো কাঠামোগত জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের যে কোনো ভুল ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করার অধিকার; অন্যদিকে অজিত ডোভালের মতো শীর্ষ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করাচ্ছেন যে, অনিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদের চেয়ে সামাজিক স্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রগঠন এবং দেশের প্রচলিত কাঠামোর প্রতি আনুগত্য প্রকাশই আগে প্রাধান্য পাওয়া উচিত।
তিলকের অবদানের কথা স্মরণ করে ডোভাল বলেন, তিলকের জীবন ভয়, যন্ত্রণা ও অশেষ কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এতকিছুর পরও তিনি নিজেকে ভারতের জাতীয় চেতনা পুনর্গঠনে একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
দেশের উদীয়মান তরুণদের রাষ্ট্রগঠনে নিজেদের পুরোপুরি উৎসর্গ করার আবেদন জানিয়ে অজিত ডোভাল বলেন, ভারতের ইতিহাসে বর্তমানে এক বিরল ও অনন্য সুযোগের দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে, যা কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেওয়া যাবে না।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে সাত, হাসপাতালে ভর্তি ১,৩৭৩ জন
তরুণদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে ডোভাল বলেন, আজ আমাদের যুবসমাজকে দেশের জন্য নিজেদের সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিতে হবে। সংকীর্ণ ব্যক্তিগত স্বার্থ বা সাময়িক লাভ-ক্ষতির চিন্তা পাশ কাটিয়ে সর্বাগ্রে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার সংকল্প নিতে হবে। ক্ষুদ্র স্বার্থ সামনে আসলেও তা উপেক্ষা করতে হবে, কারণ দেশের অগ্রাধিকার আগে; ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া অপেক্ষা করতে পারে। ভারত আজ ইতিহাসের যে ঐতিহাসিক সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে, সেই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা একটি নতুন অধ্যায় রচনা করতে সক্ষম হব বলেই আমি বিশ্বাস করি।
সূত্র: এনডিটিভি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন