০১:২২ পি.এম
॥ সাঈদ মোহাম্মদ পিতু ॥
সিলেট, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ : সিলেট একসময় ছিল প্রতিভাবান ক্রিকেটার তৈরির একটি উর্বর ক্ষেত্র। প্রায় এক দশক ধরে ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর স্থবিরতার পর, সিলেট এবার তৃণমূল পর্যায়ে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের হারানো ক্রিকেটীয় গৌরব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহ এবং পেসার এবাদত হোসেন, সৈয়দ খালেদ আহমেদ ও আবু জায়েদ রাহির মতো জাতীয় দলের একাধিক ক্রিকেটার উপহার দেওয়া এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলে নিয়মিত লিগ, স্কুল ক্রিকেট ও বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার অভাব উদীয়মান খেলোয়াড়দের জন্য টেকসই উন্নয়নের পথ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: ৪৫ বছর পর বাংলাদেশে ফিরে এসে মা-বাবাকে খুঁজছেন সেলিনা গোমেজ
দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা তরুণ ক্রিকেটারদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং অঞ্চলের ক্রিকেট সংস্কৃতিকে দুর্বল করেছে। ফলে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভা নিজেদের সামর্থ্য তুলে ধরার জন্য কোনো শক্তিশালী মঞ্চ পাচ্ছে না।
তবে সরকার, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠকদের সমন্বয়ে নতুন উদ্যোগ পরিস্থিতি পরিবর্তনের আশা জাগিয়েছে।
অঞ্চল ভিত্তিক ক্রিকেটের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সরকার সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার জন্য একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। বিসিবিও অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিলেট থেকে পরিচালক হিসেবে মনোনীত করেছে। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের ক্রিকেট কাঠামো পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় একজন অভিজ্ঞ প্রশাসক যুক্ত হয়েছেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী মনে করেন, ক্রিকেটের পুনর্জাগরণ মৌলিক জায়গা থেকে শুরু করতে হবে। বিশেষ করে ঘরোয়া প্রতিযোগিতা ফিরিয়ে আনা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য যথাযথ উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলাকে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
আরও পড়ুন: মঠবাড়িয়ায় ইয়াবা ও নগদ টাকা সহ দুইজন গ্রেফতার
ক্রিকেট প্রশাসনে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৪ সালে আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে দেশের ক্রিকেট কাঠামোকে পেশাদার রূপ দেওয়ার উদ্যোগেও তিনি যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, সিলেটের ক্রিকেট উন্নয়নে ঐতিহ্যগত শক্তির সঙ্গে প্রতিভা বিকাশের আধুনিক পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন।
কাইয়ুম চৌধুরী বাসসকে বলেন, “ওই সময়ে সিলেট থেকে উঠে আসা ক্রিকেটারদের বেশিরভাগই নিজেদের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিয়মিত লিগ ছিল না এবং খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়ায় প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।”
তিনি বলেন, সাবেক সংগঠক ও ক্লাব কর্মকর্তাদের আবারও ক্রিকেট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা, নিয়মিত প্রতিযোগিতা চালু করা এবং বয়সভিত্তিক কর্মসূচি শক্তিশালী করাই হবে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। এর মাধ্যমে তরুণ ক্রিকেটারদের জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি হবে।
সিলেটের ক্রিকেট ইতিহাসে এ অঞ্চলের সম্ভাবনার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। রাজিন সালেহ, অলক কাপালি ও আবু হাসান রাজু বাংলাদেশের হয়ে খেলেছেন। তাঁদের মধ্যে রাজিন একসময় জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন।
আরও পড়ুন: নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে আটক ২৯
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চল থেকে বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক মানের পেসারও উঠে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাহি, খালেদ ও এবাদত। তবে তাঁদের উঠে আসার ঘটনা স্থানীয় ক্রিকেট উন্নয়ন কাঠামোর আরেকটি দুর্বলতাও সামনে এনেছে। তাঁদের অধিকাংশই সিলেটের ধারাবাহিক ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর মধ্য দিয়ে উঠে আসেননি।
পেস বোলিং প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এবাদত ও খালেদকে খুঁজে পেয়েছিল বিসিবি। অন্যদিকে ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটে পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন রাহি।
সাবেক জাতীয় অধিনায়ক রাজিন মনে করেন, সুসংগঠিত ক্রিকেট কাঠামোর অভাবে তরুণ ক্রিকেটারদের একটি পুরো প্রজন্ম তাঁদের পূর্বসূরিদের পাওয়া সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
রাজিন বলেন, তাঁদের প্রজন্মের ক্রিকেটারদের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সিলেটের বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের মাধ্যমে। এরপর তাঁরা সিলেট লিগে খেলেছেন এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকার লিগে অংশ নিয়েছেন, যা জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ সোপান হিসেবে কাজ করেছে, “গত এক দশক ধরে সিলেটে কোনো যথাযথ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বা লিগ ছিল না। একসময় আমরা সিলেটে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলেছি, এরপর সিলেট লিগে উন্নীত হয়েছি। পরে আমি ঢাকায় এসে ঢাকা লিগে খেলেছি। একটি ব্যবস্থা ছিল, যেটি অনুসরণ করেই আমি ও অন্য ক্রিকেটাররা জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছি।”
আরও পড়ুন: দিনাজপুরে গণপ্রকৌশল দিবস-২০২৬ ও আইডিইবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে র্যালি ও আলোচনা সভা
তিনি প্রশ্ন রাখেন, “কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত এক দশকে কোনো লিগ বা টুর্নামেন্ট ছিল না, স্কুল ক্রিকেটও ছিল না। তাহলে ক্রিকেটাররা নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরার মঞ্চ পাবে কীভাবে?”
তবে রাজিন মনে করেন, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেট ফিরিয়ে আনতে সরকার ও বিসিবির উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটতে চলেছে।
পেস বোলিং প্রতিভা অন্বেষণে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়াকে স্বাগত জানালেও তিনি মনে করেন, সিলেট থেকে মানসম্পন্ন ব্যাটার তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রিকেটে ব্যাটিং যখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
তিনি বলেন, “বোলার খোঁজার কর্মসূচি রয়েছে এবং সেখান থেকে আমরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বোলার পেয়েছি। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট থেকে কয়েকজন বোলার উঠে এসেছেন। কিন্তু বর্তমানে সিলেটের কোনো ব্যাটারের নাম কি বলতে পারবেন? আমি জানি, পারবেন না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমাদের সবচেয়ে দুর্বল দিক ব্যাটিং- এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তাতে সেটিই মনে হয়েছে। তাই সিলেটে ব্যাটিং প্রতিভা খুঁজে বের করতে একটি কর্মসূচি আয়োজনের জন্য বিসিবির কর্মকর্তাদের প্রস্তাব দিয়েছি।”
আরও পড়ুন: নোয়াখালীতে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের পর যুবদল নেতা বহিষ্কার
এর মাধ্যমে প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচিতে খেলার একটি নির্দিষ্ট বিভাগকে প্রাধান্য না দিয়ে সব দিক অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা ফুটে উঠেছে।
আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ক্রীড়া কার্যক্রমের অবনতি শুধু সিলেটেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং অভিজ্ঞ সংগঠকদের ক্রীড়া উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগের অভাবে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির কারণে ক্রীড়াপ্রেমী অনেক মানুষ নিজ নিজ ক্রীড়া ক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও তিনি মনে করেন।
তবে নতুন সরকারের অধীনে ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের প্রশাসনে যুক্ত হওয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তনের ব্যাপারে আশাবাদী তিনি।
আরও পড়ুন: স্পিনারদের জন্য খুলছে সিলেটের উইকেট
ইতোমধ্যে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। বিভিন্ন ক্রীড়া কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে এসব কমিটিতে অভিজ্ঞ সংগঠক ও ক্রীড়ানুরাগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কাইয়ুম বলেন, “সিলেটের ক্রীড়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে আমরা একসঙ্গে কাজ শুরু করেছি। সাবেক সংগঠক এবং ক্লাব পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি বৈঠক করেছি। তাঁদের আবারও কার্যক্রম শুরু করতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত জেলা ও বিভাগীয় লিগ আয়োজনের পাশাপাশি প্রতিভাবান তরুণদের ধাপে ধাপে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য একটি উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
অভিজ্ঞ এই সংগঠক বলেন, “আমরা মাত্র যাত্রা শুরু করেছি। আমাদের হাতে বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলো একে একে বাস্তবায়ন করব। সরকার ও বিসিবি উভয় জায়গায় সঠিক দায়িত্বে সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে আমরা প্রাথমিক কাজ শেষ করেছি। ক্রিকেট অঙ্গনে সিলেটকে শক্তিশালী অবস্থানে নিতে যা যা প্রয়োজন, আমরা সবই করব।”
ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতিও দেখা গেছে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিসিবি বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কোচ নিয়োগ দিয়েছে।
সম্প্রতি বিসিবির নিয়োগ পাওয়া সিলেটের কোচ রানা মিয়া বলেন, “জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কীভাবে প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে বিসিবি আমাদের একটি নির্দেশনা দিয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে সিলেট অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৮ দল গঠন করেছি। বর্তমানে খেলোয়াড়রা নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে অনুশীলন করছে। মূল লক্ষ্য হলো প্রতিভা চিহ্নিত করা, তাদের প্রস্তুত করা এবং দেশের ক্রিকেটের পাইপলাইনকে শক্তিশালী করা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন