০১:২৮ পি.এম
শনিবার ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রাপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন, ‘দেশি-বিদেশি যেকোনো ষড়যন্ত্র—তা দেশের ভেতরেই হোক বা দেশের বাইরে থেকেই হোক—সব ষড়যন্ত্রের জবাব আমরা ঐক্যবদ্ধভাবেই দেব। এই দেশের বীর জনগণকে অতীতেও কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি, ভবিষ্যতেও কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’
প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেছেন যখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পোশাক শ্রমিকদের ব্যবহার করে নাশকতার চেষ্টা, পলাতক শক্তির নতুন করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড এবং বিরোধী দলের সরকার পতনের আন্দোলন—সবকিছুই এক সূত্রে গাঁথা। এসব ঘটনার উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো একটি নির্বাচিত সরকারকে বিপদে ফেলা। দেশের গণতন্ত্রকে বিপন্ন করা এবং বিএনপির নেতৃত্বে বাংলাদেশের যে নবজাগরণের সূচনা হয়েছে তা বিনষ্ট করা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই একের পর এক বৈশ্বিক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হচ্ছে সরকারকে। ইরান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। সেখান থেকে দেশের জ্বালানি সংকট মিটিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার চেষ্টা করছে সরকার। এ ধরনের বৈশ্বিক সংকটে দলমত নির্বিশেষে সকলের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত ছিল। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কিছু শক্তি অযাচিতভাবে এই পরিস্থিতিতে দেশের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ঘোলা পানিতে কেউ কেউ মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুর্ভাগ্যজনক।
আরও পড়ুন: কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে: হুইপ দুলুর মন্তব্য
গার্মেন্টস শিল্পের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেতা, সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং তাদের সহযোগী সংগঠন (যেমন- ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ) এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের নেতাকর্মীরা শ্রমিক অসন্তোষকে উস্কে দিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছেন বলে সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
সরকারের একাধিক মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে, আসন্ন ডিসেম্বর মাসকে সামনে রেখে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে নিরপরাধ শ্রমিকদের ব্যবহার করছে। শ্রমিকদের এই আন্দোলন অধিকার আদায়ের আন্দোলন নাকি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য এই আন্দোলন। হঠাৎ শ্রমিকদের এই আন্দোলন ঘিরে তাই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠে নেমে আন্দোলনকে আরো ত্বরান্বিত করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দলের সুবিধাভোগী সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা এই অস্থিরতার পেছনে মূল ইন্ধনদাতা। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ এবং ছাত্রলীগ ছদ্মবেশে মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের শ্রমিক আন্দোলনের ভেতর ঢুকে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর উসকে দিচ্ছে। এ ধরনের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই সময় প্রধান বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসনসহ ৭ দফা দাবিতে ঢাকা থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে লং মার্চ পালন করছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে এ কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর দ্বিতীয় দফা ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর এবং সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে হয় তৃতীয় লং মার্চ।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, গ্রেপ্তার ৩ জন
ঢাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বশেষ গন্তব্য পর্যন্ত একাধিক পথসভায় বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা—যেখানে সরকারবিরোধী তীর্যক বক্তব্য দিয়েছেন তারা। এমনকি সরকারের পতন ও নতুন বিপ্লবেরও হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। সামনে বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিং বিভাগেও একই কর্মসূচি রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের পৌনে এক বছরের মাথায় এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে কী অর্জন করতে চায় বিরোধী দল? তারা কি এখনই সরকারকে ভিন্ন কোনও বার্তা দিতে চায়?
সরকারের মাত্র ৮ মাসের মাথায় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের এতটা কঠোরতা কেন, বা লং মার্চের মতো কর্মসূচি দেওয়ার পরিস্থিতি কি এখনই হয়েছে? সংসদের বাইরে এ ধরনের কর্মসূচি গণতন্ত্রকে শুধু দুর্বল করবে না, গণতন্ত্রকে ঝুঁকিতে ফেলবে। বিরোধী দল কি দীর্ঘ সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে চায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিরোধী দলের এই কর্মসূচির কারণে পলাতক রাজনৈতিক শক্তি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ পাচ্ছে। গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নাশকতা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
আরও পড়ুন: সংসদের চতুর্থ অধিবেশন বসছে সোমবার, আসতে পারে কয়েকটি বিল
গত শনিবার, রাজধানীর মিরপুর-১২ নম্বর এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। তবে বাসের কর্মী ও স্থানীয় লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাজধানী ঢাকায় এক রাতেই অন্তত ৮টি ককটেল বিস্ফোরণ ও একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আদাবর, শাহবাগ, বিমানবন্দর, খিলগাঁও ও মিরপুরের কালশী এলাকায় এসব বিস্ফোরণ ঘটে।
একই সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারা এলাকায় প্রগতি সরণিতে বৈশাখী পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগের দিন রাজধানীর রায়েরবাজারে কৃষি মার্কেটের সামনে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এতে গাড়ির চালক আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার মাধ্যমে দেশে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। যারা এসব ঘটনার সাথে জড়িত তারা স্পষ্টভাবে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্টের চেষ্টা করছে। আর এসব ঘটনার সাহস পাচ্ছে বিরোধী দলের কর্মসূচির কারণে। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল সেই ঐক্য যত দুর্বল হবে, ততই পতিত স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ সুগম হবে। এর ফলে দেশ আবার অস্থিতিশীল হবে। বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। নতুন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাবে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে হলে সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নাশকতার বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ঐক্যের ডাকই দিয়েছেন বিপ্লব ও সংহতি দিবসে।
আরও পড়ুন: স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির পঞ্চম বৈঠক, যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী
আসুন—ঐক্যবদ্ধ হই, দেশ বাঁচাই, গণতন্ত্র রক্ষা করি। দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়াই একসাথে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন