০৯:২১ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির ফলে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। ঐ যুদ্ধের অবসান ঘটানোর একটি বৃহত্তর বোঝাপড়ার অংশ হবে এই বিনিয়োগ।
উভয় পক্ষ গত রোববার (১৪ জুন) ডিজিটালি ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরদিন গত সোমবার (১৫ জুন) সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, এই সুবিধাগুলো ইরানের চুক্তি মেনে চলার ‘পারফরম্যান্স’ বা কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে।
আরও পড়ুন: কেপিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের শরণাপন্ন পিটিআই
২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ইরান পরমাণু চুক্তিকে (জেসিপিওএ) দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলতেন, ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে অনেক সুবিধা দিয়েছিল।
তবে খোদ ট্রাম্পের আমলেই এখন এই নতুন চুক্তিতে আরও বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধার কথা শুনে রাজনৈতিকভাবে সমালোচনা শুরু হয়েছে। যা এড়াতে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে বলে যে খবর সামনে এসেছে তা সম্পূর্ণ ভুয়া খবর (ফেক নিউজ)।’
আর ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স সিবিএসকে বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে কোনো মার্কিন অর্থ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘যখন লোকে বলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড়া হবে, তা সত্য নয়। সত্য হলো, ইরান যদি চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালন করে তাহলে তাদের ভবিষ্যৎ অনেক সমৃদ্ধ ও উন্নত হবে।’
ভ্যান্স বলেছেন, এই চুক্তি মূলত ইরানের দিকে একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তিনি বলেন, ‘যদি তোমরা তোমাদের দায়িত্ব মেনে চলো, নিউক্লিয়ার প্রোগ্রামে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক তদন্ত করতে দাও, তাহলে আমরা তোমাদের বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বাগত জানাব।’
আরও পড়ুন: বায়োমেট্রিক তথ্য না দিলে বাতিল হবে ভোটার নিবন্ধনের আবেদন
তিনি আরও জানান, এই তহবিল গাল্ফ কোস্ট কোয়ালিশন (উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট) থেকে আসবে। ইরান যদি তার প্রতিশ্রুতি পালন করে, তাহলে তারা এই তহবিলের সুবিধা পাবে। সরাসরি মার্কিন সরকারি টাকা দেওয়া হবে না, তবে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিতে ফিরে এলে অনেক অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে।
নিউইয়র্ক টাইমস সূত্রে জানা গেছে, এই তহবিল সরকারি অর্থে নয়, বরং ইরানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে গড়ে উঠবে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুম (মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স) বলেছেন, এটি ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘জিত-জিত’ সমাধান। ইরান যদি সংস্কার করে তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন শান্তির কৃতিত্ব নেবে। আর যদি না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কিছুই হারাবে না—ঝুঁকি নেবে গাল্ফের দেশগুলো।
বিশ্লেষক সেলুম বলেন, বিনিয়োগ তহবিলের এই ধারণাটি ইরানের জব্দকৃত অর্থ সরাসরি ছাড়ার বাজে রাজনৈতিক চিত্র এড়ানোর জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ইরানের জব্দকৃত সম্পদের সঠিক পরিমাণ নিয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই, তবে ইরানি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
আরও পড়ুন: মেয়ের সঙ্গে প্রকাশ্যে কিম জং উন, মৃত্যুর গুজব অস্বীকার
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে নিউক্লিয়ার ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। ফলে ইরান তার নিজস্ব সম্পদ (যেমন তেল বিক্রির আয়) বিদেশি ব্যাংকে জব্দ হয়ে আছে।
২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় নিউক্লিয়ার চুক্তির মাধ্যমে কিছু সুবিধা পেলেও ট্রাম্প ২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি বাতিল করেছিলেন। প্রায় আট বছর পর ইরানের সঙ্গে একেবারে নতুন করে চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন তিনি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ জানিয়েছে, ১৪ দফার খসড়া সমঝোতায় ২৪ বিলিয়ন ডলার জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ভ্যান্স সিবিএসকে বলেছেন, চুক্তির কোনো কাগজপত্রে ২৪ বিলিয়ন ডলারের কোনো উল্লেখ নেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা সম্পদ ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি, কিন্তু তার চেয়ে বড় বিষয় হলো ইরানের পুরো অর্থনীতির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া—যদি তারা নিউক্লিয়ার কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দেয়।’
আরও পড়ুন: স্কুলশিক্ষকের রক্তাক্ত ছবি পাঠিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবি, তদন্ত চলছে
ইরানের জন্য এই তহবিল খুবই জরুরি। যুদ্ধে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে এবং দেশটিতে ১৯৪২ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। তবে বিশ্লেষক সেলুম বলেন, এতে ইরানের জন্য ‘মর্যাদার সমস্যা’ তৈরি হয়েছে। তারা এটাকে ‘তত্ত্বাবধানে রাখা শর্তসাপেক্ষ অর্থ’ হিসেবে দেখছে, সার্বভৌম স্বাধীন সুবিধা হিসেবে নয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে আরও আলোচনা হবে:
নিউক্লিয়ার কর্মসূচি: ইরানের কাছে ৪৪০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে। ইরান এগুলো সমর্পণ করবে, নিয়মিত আন্তর্জাতিক তদন্ত মেনে নেবে এবং নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরি বা ক্রয় করবে না বলে সম্মত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী: যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষের অবরোধের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া। ট্রাম্প বলেছিলেন “তেল প্রবাহিত হোক”, কিন্তু ভ্যান্স বলেছেন এখনও সব বিষয় পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবকে বাঁচাতে যুক্তরাজ্যের টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন
লেবানন ইস্যু: ইরান চায় তার মিত্র লেবাননের উপর ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইসরায়েল এখনও কোনও সীমাবদ্ধতা মানতে রাজি নয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন