১০:০২ এম
হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ১৫ দিন ধরে চাহিদার তুলনায় অল্প গ্যাস পাওয়া গেলেও বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এতে করে সংশ্লিষ্টভাবে ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার কারণে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের উৎপাদন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষত, রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাস-সিএনজির সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নিহত, আহত ৪
উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন জানিয়েছেন, তাদের শিল্পপার্কে মোট ছয়টি কারখানা রয়েছে। টায়ার ও পাওয়ার প্লান্ট ছাড়া অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানই সম্পূর্ণরূপে রপ্তানিমুখী।
শিল্পপার্কে শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন। কারখানাগুলোর দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ কয়েকদিন ধরে মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। এতে উৎপাদন চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে।
স্টার সিরামিকসের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা পল্লব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার দুপুর থেকে তা পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন: কেন্দুয়ায় পাচারের সময় ৩২ বস্তা সার জব্দ, চালক পালিয়েছে
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে সাড়ে ১৩ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন হতো। বর্তমানে পুরো উৎপাদন বন্ধ, ফলে দৈনিক প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার ক্ষতি হচ্ছে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দেড় কোটি টাকা।
হবিগঞ্জের স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ জানান, কিছু দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ঠিকভাবে করা যাচ্ছিল না। এখন গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার কাজও বন্ধ রয়েছে এবং তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মস্থলে এসে অলস সময় পার করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চললে তাদের আয়-রোজগার ও সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।
একটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জের সব শিল্প-কারখানায় একইভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো গ্যাস পাচ্ছে। তিনি জানান, আমাদের গ্যাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু কোম্পানিতে এখনও গ্যাস সরবরাহ চলছে। তাহলে একই এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ভিন্নতা কেন? এটা বৈষম্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: উখিয়ায় ১৫ ঘণ্টা পরও জ্বলছে গ্যাসের আগুন, ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ
তিনি আরও জানান, গ্যাস সংকট যদি জাতীয় সমস্যা হয়, তাহলে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রয়োগ করা উচিত। কোন প্রতিষ্ঠান গ্যাস পাবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান গ্যাস পাবে না—এ ধরনের বৈষম্য শিল্প খাতের জন্য আরও সংকট তৈরি করবে।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তিনি জানান, কয়েকদিন ধরে গ্যাস সংকট চললেও বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সরবরাহ একেবারে শূন্য হয়ে গেছে, ফলে শিল্পপার্কের সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেছেন, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু বুধবার বিকেল তিনটা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে কারখানার প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বায়ারদের অর্ডার নেওয়া আছে, কিন্তু এখন উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একসময় বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
আরও পড়ুন: তাহিরপুরে প্রবাসীর স্ত্রী ও পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে উধাও নাজমুল, পরিবার উদ্বিগ্ন
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানিমুখী।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। গ্যাস না থাকায় ক্যাপটিভ পাওয়ারও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ ও উৎপাদন—দু’দিক থেকেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শিল্প-কারখানাগুলো।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই গ্যাস সংকট শুরু হয়। প্রথমদিকে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ কমানো বা বন্ধের বিষয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছে। তবে কেন সরবরাহ কমানো বা বন্ধ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে চিঠিগুলোতে স্পষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি বলে দাবি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে ‘দাদা ভাই বাহিনী’র বন্দুকযুদ্ধে ৫ জেলে উদ্ধার
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সংকট শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমাতে হয়েছে। তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে, শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক ক্রেতাদের আস্থা—সব কিছুই ঝুঁকিতে পড়ছে বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। উদ্যোক্তারা শ্রমিক-কর্মচারীদের পাশাপাশি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লার আদালতে মহিলা আ.লীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ, আটক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন