১১:৫৪ পি.এম
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ আর কেবল একটি ভৌগোলিক অবস্থানের নাম নয়; এটি এখন ইন্দো-প্যাসিফিক, বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। বিশ্ব পরাশক্তি গুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাখতে হলে যে পদক্ষেপগুলো একজন সরকার প্রধান হিসেবে নেয়া প্রয়োজন সেই পথ অনুসরণ করে বর্তমান সরকার প্রধান চলছেন বলে প্রথম সফরেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তার পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত বর্তমান সরকারের দূরদর্শিতা সেটাই প্রমাণ করে।
বর্তমান সরকার প্রধান ক্ষমতায় আসার পূর্ব এবং পরবর্তী সময়ে অনেকে ধারণা করেছিলেন, হয়তো তিনি পূর্বের সরকারের মত কারো সেবাদাস হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। কিন্তু তার ধী-শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, কৌশলগত দূরদর্শিতা, রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা প্রমাণ করে তার প্রথম দুটি দেশের সফর। প্রথম সফরে মালয়েশিয়া এবং পরবর্তী সফরে নিকটতম প্রতিবেশী , পরবর্তী সম্ভাব্য সুপার পাওয়ার ও আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষিত মিত্র চীন সফরে গিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র যা কারো গোলামী বা সেবাদাস হিসেবে কিংবা কারো করতলগত হয়ে থাকার জন্য সৃষ্টি হয়নি। পাশাপাশি যারা তার সমালোচনা করেছিলেন বা আশঙ্কা করেছিলেন যে, তিনি পূর্বের ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার মত কারো সেবাদাস হয়ে বা আশীর্বাদ পুস্ট হয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকবেন, তেমন আশংকার জায়গা থেকে তিনি নিজের অবস্থান পানির মত স্বচ্ছ করেছেন।
দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় তার পিতা বাংলাদেশের প্রথম বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এবং তার যোগ্য সহধর্মিনী তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী দেশ ও স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে তাদের দেখানো পথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দূরদর্শিতা নিয়ে পথ চলছেন একথা এই কয়েক মাসের রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে দেখে মনে হয় - বলা অমূলক নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর এবং দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। কোনো রাষ্ট্রের নতুন সরকারের প্রথম দিককার উচ্চপর্যায়ের বিদেশ সফরকে কূটনীতিতে সাধারণত অগ্রাধিকার ও নীতিগত দিকনির্দেশনার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন ও অবকাঠামো সহযোগী। ভবিষ্যতে যদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ খাতে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কিংবা তিস্তা অববাহিকার উন্নয়নের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে বিকল্প অংশীদারদের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সহযোগিতা জাতীয় স্বার্থের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একইভাবে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার আধুনিকায়নও আজকের আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বহু দেশের স্বাভাবিক নীতির অংশ। ভবিষ্যতে যদি আন্তর্জাতিক আইন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ বা শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়, তবে তা দেশের আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য উপাদান হতে পারে। এসব বিষয়ে যেকোনো পদক্ষেপের সাফল্য অবশ্যই নির্ভর করবে স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যের ওপর। বিশেষ করে বাংলাদেশে চীনের বিশাল বিনিয়োগ সৃষ্টি করা, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ফোর পয়েন্ট ফাইভ জেনারেশনের সর্বাধুনিক মাল্টিরোল কমব্যাট ফাইটার জেট সহ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামাদি ক্রয় করা, রাষ্ট্র প্রতিরক্ষায় নজরদারি বা স্যাটেলাইট ব্যবস্থা শেয়ার এর মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ আনয়নের মাধ্যমে ড্রোন, এটাক ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সহ দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির প্রযুক্তি কারখানা স্থাপন করে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি বিদেশে দেশীয় তৈরি অস্ত্র রপ্তানি করার যোগ্য করে তোলা, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি নিশ্চিত করা এ বিষয়গুলো একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা দূরদর্শিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো—বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। একটি কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে, যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা একসঙ্গে শক্তিশালী হয়। মালয়েশিয়ার পর চীনে প্রথম সফর বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সেই দূরদর্শিতার পরিচয় কিংবা ইঙ্গিত বহন করে।
পাশাপাশি মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ বিভিন্ন সময়ের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাওয়া পাকিস্তান থেকে অত্যাধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার জেট ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি ত্বরান্বিত করা কিংবা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ,সামরিক ও অর্থনৈতিক কিংবা বাণিজ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় বর্তমান সরকার পূর্বের মতো একই গতিতে এগিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সেই সাথে শক্তিশালী মুসলিম ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ তুরস্কের আগ্রহ থাকায় সেই দেশের অপারেশনাল সর্বাধুনিক অ্যাটাক হেলিকপ্টার ক্রয় কিংবা বায়রাখতার টিবি টু ড্রোনের আমদানি কিংবা কারখানা তৈরি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অ্যাটাক ড্রোন কারখানা স্থাপন এবং সমরাস্ত্র শিল্পে বিপ্লব ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় সামরিক সরঞ্জাম যাতে দেশেই উৎপাদন করে সমরাস্ত্র শিল্পের মাধ্যমে রপ্তানি করে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো যায় সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পথেও হাঁটবে সরকার এমনটা প্রত্যাশা করা এখন খুব বেশি বড় কিছু নয়।
অতএব, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন আজই করা সম্ভব নয়। তবে এগুলোর বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাবই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কতটা কার্যকর হয়েছে। ইতিহাসে রাষ্ট্রের অবস্থান শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তব অর্জন, কৌশলগত প্রজ্ঞা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় নেওয়া সফল পদক্ষেপের মাধ্যমে।
পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতার প্রশ্নে অনেক বিশ্লেষকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছিল, বর্তমান সরকারও সেসব ক্ষেত্রের কিছু উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে চীন, পাকিস্তান তুরস্ক, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপ সহ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সমঝোতা স্মারককে অনেকেই সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
একই সঙ্গে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং অন্যান্য অংশীদার রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সম্ভাব্য নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণের আলোচনা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে—যদি সেগুলো জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষা করে বাস্তবায়িত হয়।
রাষ্ট্রীয় অভ্যন্তরীণ শত্রু ও বৈদেশিক দালালদের প্ররোচনা মুক্ত থেকে শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তার মূল্যায়ন নির্ভর করবে বাস্তব চূড়ান্ত চুক্তি কিংবা তার ফলাফল, অর্থনৈতিক অর্জন এবং বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করতে সেগুলোর কার্যকারিতার ওপর।
তবে সকালের সূর্য দেখে যেমন দিন চেনা যায়, তেমনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় আসার পর চীন সফরে গিয়ে সমঝোতা স্মারক কিংবা অন্যান্য বিষয়ে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সেই দিকটি স্পষ্ট করেছেন যে বাংলাদেশ এখন আর কোন পরাধীন রাষ্ট্র নয়। তিনি তার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপোসহীন নেত্রী তার যোগ্য সহধর্মিনী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছেন এর লক্ষণ এখন দেশের ১৮ কোটি মানুষের কাছে স্পষ্ট এমন কথা বলা মনে হয় অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন