১১:১৩ পি.এম
রাজশাহীর তানোর উপজেলা কৃষি প্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানে কৃষির উপর নির্ভরশীল জনসাধারণের জীবনধারণের মূল ভিত্তি ধান চাষ। তবে, এবারে আউশ ধানের দাম কমে ৬০০ টাকা (২৮ কেজিতে মন) হয়ে গেছে। চলতি মৌসুমে কৃষকরা ধানের চাষাবাদ করে হতাশ হয়ে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ কোনভাবেই উঠছে না। চাষাবাদের জন্য সকল কিছুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা নিরব দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, তানোর পৌর এলাকার রহিমা ডাংগা নামক স্থানে ১৫০ থেকে ২০০ বিঘা আউশ ধানের চাষাবাদ করেছেন কৃষকরা। তারা প্রতি বছর আউশ ধান চাষ করেন। ধান কাটার পর তারা আগাম আলু রোপন করেন। কিন্তু এবারে ধানের দাম বিগত বছরের তুলনায় নেই বললেই চলে।
বরুজ গ্রামের তরুণ কৃষক জুয়েল আক্ষেপ করে বলেন, "চাষাবাদ আমাদের জীবনে অভিশপ্ত হয়ে পড়েছে।" তিনি জানান, রহিমা ডাংগায় ৭ বিঘা জমিতে আউশ ধানের চাষাবাদ করেছিলেন। সেভেন ও ছিয়াত্তর জাতের ধান রোপন করেছেন। ধান কাটা হয়ে গেছে, কিন্তু দাম নেই। তিনি বলেন, "কিছু কাঁচা ধানও কেউ নিতে চাচ্ছে না।" বস্তা ঠিকা বা ৬০০ টাকা মন ধান বিক্রি করতে হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিঘায় ১৮ থেকে ১৯ মন ধান হয়েছে এবং মেশিনে কাটা মাড়ায় করা হয়েছে। রহিমা ডাংগার বেশিরভাগ কৃষকরা লীজ নিয়ে আবাদ করেন, কারণ তারা আবার আলু চাষাবাদ করেন। এক বিঘা জমি ১২ হাজার টাকায় লীজ নিতে হয়। রোপণ থেকে কাটার আগ পর্যন্ত খরচ ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।
কাটা মাড়ায় ৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। জমি থেকে রাস্তা, রাস্তা থেকে বাড়িতে আনতে বাড়তি ভাড়া। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বিঘায় খরচ ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। বিঘায় ১৮ মন ধানের ৬০০ টাকা মন হলে ১০ হাজার ৮০০ টাকা দাম আসে। ফলে লোকসান ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা হচ্ছে। লীজের টাকা ধরা হলে বিঘায় ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এইভাবে কতদিন লোকসান গোনা যায়? এক মৌসুমের লোকসান দূর করতে কয়েক মৌসুম চাষ করতে হয়। জয়নাল নামের কৃষক ৫ বিঘা, সবুজ নামের কৃষক ৯ বিঘা, ভবেশ ৫ বিঘা এবং মইনুল সাড়ে ৫ বিঘা জমিতে আউশ ধানের চাষ করে লোকসান গুনছেন।
আরও পড়ুন: ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে নাসিরনগরে বিএনপির র্যালি, অংশগ্রহণের আহ্বান জামাল আহমদের
তারা জানান, ধান চাষের জন্য সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ধানের দাম ৬০০ টাকা মন। যা বিগত সময়ে কখনো এমন দাম হয়নি। প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়লেও ধানের দাম কমে যাচ্ছে। আবার ধান কাটার সময় সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। কৃষকরা জানান, এই উপজেলা কৃষি প্রধান হিসেবে ধরা হয়। কৃষি চাষাবাদে চলে সংসার ও জীবনযাপন। কিন্তু বর্তমানে কৃষিতে ধস নেমেছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধানের আবাদ হয় এই উপজেলায়। বর্তমানে রোপা আমন ধান মাঠে বিরাজমান। প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম না থাকার কারণে চাষীদের ঘরেঘরে এক প্রকার দুর্ভিক্ষ বিরাজমান। সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবৃত্ত কৃষকরা।
তারা না পারছেন চাইতে, না পারছেন সইতে। কারণ ধান তাদের সারা বছরের খোরাক জোগায়। সেই ধানের এই অবস্থা। আশি নব্বই দশকে শোনা যেত কার্তিক মাস মানে চরম অভাব অনাটন আর ঘরেঘরে দুর্ভিক্ষ। বর্তমানে কয়েক বছর ধরে সেই কার্তিক মাসের দুর্ভিক্ষ ও অভাব অনাটনে পড়েছেন কৃষকরা। তবে, চরম কষ্টে কৃষকরা দিন কাটালেও চাকুরীজীবিদের বেতন বাড়তেই আছে। একদিকে কৃষক মরছে, অন্যদিকে চাকুরীজীবিরা আরামে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ এই পা ফাটা কৃষকরা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছেন। কৃষকরা চাষাবাদ করে বলেই তো খাবার পাওয়া যাচ্ছে। আর সেই খাদ্য যোদ্ধারা খাদ্যাভাবে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব কৃষি বিপণন বিভাগের। কিন্তু তারা উদাসীন।
তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহমেদ জানান, কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে কৃষি বিপণন বিভাগ। কৃষি দপ্তর চাষাবাদ কিভাবে হবে, কিভাবে রোগবালা দূর হবে এসব নিয়ে কাজ করে। কৃষি পণ্যের দাম নিয়ে তাদের কিছুই করার নেই। এবছর তানোর উপজেলায় ৮ হাজার ৫শ' ৭৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়েছে বলেও তিনি জানান।
আরও পড়ুন: মধুপুরে টনসিল অপারেশনের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি, আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন