০৭:৩৯ পি.এম
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে ‘রেসকিউ ও স্যালভেজ অপারেশনের’ মাধ্যমে, এমন মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারের চেহারা পরিবর্তিত হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন থেকে বের হয়ে নতুন অর্থায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে। এ লক্ষ্যে সরকার প্রয়োজনীয় কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত রয়েছে।
রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আরও পড়ুন: এইচএসসির খাতা পুনর্মূল্যায়ন আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধি, ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮২ শিক্ষার্থী আবেদন করেছেন
অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান সভাপতিত্ব করেন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। অর্থনীতির পাশাপাশি পুঁজিবাজারকেও গভীর সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, এটি এখন রেসকিউ অপারেশন এবং স্যালভেজ অপারেশন। পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কিছু কঠিন ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিন্তু এর বিকল্প নেই।
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের অর্থায়ন ব্যবস্থায় ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারী, সরকার ও বেসরকারি খাত—সবাই মূলত ব্যাংকনির্ভর। তবে স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার ফলে কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। তাই ‘হাই স্ট্রিট ব্যাংকিং’ থেকে বের হয়ে ‘ওয়াল স্ট্রিটে’ যেতে হবে। পুঁজিবাজারকে বিকল্প অর্থায়নের প্রধান পথ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আরও পড়ুন: টেকনাফে মানবপাচারকারীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিল যৌথ বাহিনী
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পুঁজিবাজার পুনরুদ্ধারে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান একা সফল হতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং আর্থিক প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এতদিন প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা আলাদাভাবে কাজ করেছে। এখন পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেমের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারের অংশীজনদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করার ওপরও গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ব্রোকার, স্টক এক্সচেঞ্জ, কেন্দ্রীয় ডিপোজিটরি, আর্থিক প্রতিবেদক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে হলে পুঁজিবাজারকে ‘ক্যাসিনো’ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের আর্থিক স্থাপত্যে বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্কে ডলার বন্ড, হংকংয়ে বাংলাদেশভিত্তিক ইকুইটি ফান্ড, পাণ্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড, স্থানীয় বন্ড ও স্থানীয় মুদ্রার বন্ডসহ বিভিন্ন অর্থায়ন ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে।
আরও পড়ুন: ধর্মমন্ত্রীর আহ্বান: দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে ঐক্যবদ্ধ থাকুন
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে হলে উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বর্তমান উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এক বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারের চেহারায় বড় পরিবর্তন আসবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার ঘানি বলেন, গত চার মাসে পুঁজিবাজারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হয়েছে। সরাসরি তালিকাভুক্তির নিয়ম পুনর্গঠন, আইপিও অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনা, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া, সার্কিট ব্রেকার ব্যবস্থায় সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ বিতরণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের পাশাপাশি কনভার্টিবল বন্ড, রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিটস), কর্মীদের ইকুইটি স্টক অপশন ও স্থানীয় মুদ্রার বন্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বীমা ও পেনশন খাতের অর্থ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ ও এনবিআরের চার নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাসিক সমন্বয় সভাও শুরু হয়েছে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, নতুন ব্যবস্থায় আইপিও অনুমোদনের সময় কমিয়ে তিন মাসে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইপিওতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে মূল্যায়ন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: চিকিৎসার জন্য অনুদান নিলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে প্রতারণা ও অনিয়ম ঠেকাতে ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ব্রোকারদের ব্যাক অফিস সফটওয়্যার একীভূত করা, রিয়েল টাইমে নজরদারি, অ্যাপভিত্তিক অর্ডার ব্যবস্থাপনা এবং কাগজের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ এবং ক্লিয়ারিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে নতুন ব্যবস্থায় কার্যকর করার কাজ চলছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন